জামালপুরে জানালা দিয়ে ‘পানি পানি’ আর্তনাদে তালা ভেঙে উদ্ধার করা দুই শিশুর মা ইশরাত জাহান মিমির হত্যাকারী কাউসার আহম্মেদ খানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। গ্রেপ্তারের পর কাউসারের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে।
কাউসারের সঙ্গে ইয়াবা আসক্ত ওই গৃহবধূর তিন বছর ধরে ছিল অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক। কাউসারকেও তিনি বানিয়েছিলেন ইয়াবা সেবনের পার্টনার। তাদের সম্পর্ক চলাকালীন কোন এক সময়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে কাউসারকে ধারাবাহিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন ওই গৃহবধূ। কাউসারের টাকায় করতেন বিলাসী জীবনযাপন।
২৫ আগস্ট, মঙ্গলবার দুপুরে জামালপুর পিবিআই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত।
গ্রেপ্তার কাউসার আহম্মেদ খান (৩২) জামালপুর শহরের মনিরাজপুর এলাকার রফিক খানের ছেলে। নিহত গৃহবধূ ইশরাত জাহান মিমি পাথালিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার মো. আবু সাইদের মেয়ে।
তিনি আরও জানান, ২০১৪ সালে ইশরাত জাহান মিমির সঙ্গে জনৈক শাওনের সাথে বিয়ে হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় এক মেয়ে ও এক ছেলে। শাওন ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করার পর সন্তানদের নিয়ে জামালপুর শহরে বসবাস করতে থাকেন মিমি। হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন বছর আগে কাউসার আহমেদ খানের রাফি স্টোর নামে মনোহারি দোকানে মিমি কেনাকাটা করতেন।
সেই সুবাদে দুজনের পরিচয়। স্বামী কাতারে আছে বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মিমি নিয়মিত কাউসার আহমেদ খানের দোকানে গিয়ে নগদ ও বাকিতে কেনাকাটা করতেন। দোকানের বকেয়া টাকা পরিশোধ করার জন্য কাউসারকে বাসায় ডেকে নেন মিমি। কাউসার তার বাসায় গেলে পরিকল্পিতভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেন এবং বলেন যে, তার স্বামী কিছুদিন আগে মারা গিয়েছেন।
ওইদিনই অনৈতিক প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যান কাউসার। গৃহবধূ মিমি পরিকল্পিতভাবে গোপনে ভিডিও ধারণ করে রাখেন শারীরিক সম্পর্কের মুহূর্তটি। পরবর্তীতে কাউসারকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা আদায় করতে থাকেন এবং কাউসারের টাকায় উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন শুরু করেন।
মিমি নিজেও ইয়াবা সেবন করতেন। একই সঙ্গে কাউসারকে ইয়াবা সেবনে আসক্ত করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করতে থাকেন। এভাবে কাউসার তার সঞ্চিত টাকা শেষ করার পর জামালপুর শহরের জায়গা-জমি বিক্রি এবং মা ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রির টাকা মিমির পেছনে ব্যয় করেন।
পুলিশ সুপার আরও জানান, গৃহবধূ মিমি ব্ল্যাকমেইল করার জন্য বিভিন্ন ধনী লোকজনদেরকে টার্গেট করতেন। কাউসারকে ওই সমস্ত লোকজনদের ফাঁদে ফেলে বাসায় নিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। কাউসার কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় মিমি ঘটনার দিন কাউসারকে ফোন করে তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। মোটা অংকের টাকা দাবি করলে তাদের মধ্যে শুরু হয় বাকবিতন্ডা। একপর্যায়ে মিমি কাউসারের স্ত্রীকে ফোন দিয়ে তাদের অবৈধ সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেন। মিমি বলেন যে, কাউসার তার সাথেই আছেন। কাউসারের সাথে তার স্ত্রীকে কথা বলিয়ে দিতে গেলে কাউসার কথা বলতে না চাওয়ায় তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে কাউসার ইশরাত জাহান মিমির গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঘটনাস্থল হতে পালিয়ে যান।
তিনি আরও জানান, লাশ উদ্ধারের আগের দিন ২২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ২৩ আগস্ট উদ্ধার করা হয় ওই গৃহবধূর লাশ।
এই ঘটনায় নিহত মিমির মা মুক্তা বেগম বাদী হয়ে কাউসারসহ অজ্ঞাতনামা দু’জনকে আসামি করে জামালপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
উল্লেখ্য, ২৩ আগস্ট, রবিবার সকাল ১০টায় জামালপুর শহরের পশ্চিম নয়াপাড়া রেলগেইট সংলগ্ন বাবুল মিয়ার বিল্ডিংয়ের ৫ম তলার পূর্ব পাশে রুমের ভেতর থেকে ইশরাত জাহান মিমির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
মো. আলমগীর : নিজস্ব প্রতিবেদক, জামালপুর, বাংলারচিঠিডটকম 


















