মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর সফল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। তাঁর কাজ, কর্ম ও সৃষ্টিশীলতা একসময় বৃহৎ পরিসরে স্থান করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। তেমনি এক অদম্য সাহসী, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেড়ে উঠা সফল নাট্যকার, নির্দেশক ও বলিষ্ঠ অভিনেতা— আসাদুল্লাহ ফারাজী।
তাঁর পৈতৃক নিবাস জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলাস্থ টুপকারচর গ্রামে। ১৯৫৩ সালে ১৯ জুন বাবার চাকরিসূত্রে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় বসবাসের পর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। বাবা মোহাম্মদ আলী ফারাজী ও মা সাহেবা খাতুনের আট সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯৭২ সালে ফুলকোচা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৭৪ সালে জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে স্নাতকে অধ্যয়ন করলেও চাকরি সুবাদে চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি তাঁর।
কর্মজীবনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ‘পরিদর্শক’ হিসাবে ১৯৭৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তাহমিনা আসাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্যজীবনে দুই পুত্র সন্তান। ইসতিয়াক জাহান তপন ও ইমতিয়াজ জাহান তাপস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য তিনি ভারতে গমন করেন। এরপরে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু টেকনিক্যাল কিছু সমস্যায় মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি পেতে সময়ক্ষেপণ করতে হয়।
গ্রামেগঞ্জে মাঝে মাঝে নাটক মঞ্চায়ন হত। তিনি সেগুলো ছোট থেকেই দেখতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের ইচ্ছে জাগে। আশেপাশে কোথাও যাত্রাপালা হলে ছুটে যেতেন সেখানে। শৈশব থেকেই নাটকের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ।
গ্রামীণ মঞ্চ, যাত্রাপালা ও লোকজ অভিনয় তাঁকে আকৃষ্ট করত। সেই আকর্ষণ থেকে স্কুলজীবনেই নাটক লেখা ও অভিনয়ের সূচনা। ১৯৬৭ সালে প্রথম মঞ্চে অভিনয় এবং পরবর্তীতে নাট্যরচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ নাট্যযাত্রা। শীত মৌসুমে গ্রামের ছেলেরা মিলে নিজেরাই নাটক পরিচালনা ও মঞ্চস্থ করতেন। ১৯৭৫ সালে তিনি একটা পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা করেন। এরপর থেকেই বছরে বছরে নাটকের খাতা বাড়াতেন।
১৯৭৮ সালে তাঁর লেখা নাটক ‘ভুলকরে’ প্রথম মঞ্চে আসে। তখনই ভাবনায় আসে থিয়েটার প্রতিষ্ঠার। ১৯৮৩ সালে শুরুর দিকে মেলান্দহ রেলস্টেশন এলাকায় কয়েকজন আগ্রহী নাট্যকর্মী মিলে প্রতিষ্ঠা করেন শহীদ সমর থিয়েটার। সবাই থিয়েটারেই নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করেন। সে বছরই বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে যুক্ত হয় তাদের থিয়েটার। সেখানে আগমন করেন নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন ও নাট্যনির্দেশক বীরমুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। দু’জন নাট্যজনের সাহচর্যে সখ্য গড়ে উঠে। এরপরই সাংগঠনিকভাবে নাট্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনে নিজেকে এবং থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করেন।
গ্রাম থিয়েটার আয়োজিত অভিনয় কর্মশালা, নাট্যকার ও নির্দেশনা কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। তারপর থেকেই নাটক রচনায় উৎকর্ষতা সাধিত হয় এবং তাঁর লেখায় বর্ণনাত্মক রীতির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এই দু’জন ছাড়াও তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, আফজাল হোসেন, অধ্যাপক আফসার আহমেদ, অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, সালাম সাকলাইন ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কাজ করেন।
তাঁর রচিত ১৯টি পূর্ণাঙ্গ এবং বেশ কয়েকটি অসম্পূর্ণ নাটক রয়েছে। তন্মধ্যে ১৬টি ছাপানো হয়েছে। নাটকের মধ্যে দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে ‘সী-মোরগ’। যা ঢাকাস্থ বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে প্রায় তিন শতাধিক বার মঞ্চস্থ হয়েছে এবং এখনো অব্যাহত আছে। তাঁর রচিত কয়েকটি নাটক বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এর পর্দায় প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘সী-মোরগ’, ‘বীরাঙ্গণা বিমলারা’, ‘সোহাগী বাঈদানীর ঘাট’ অন্যতম।
এছাড়াও তাঁর রচিত নাটক— ‘বারতপুরের ক্যাচাল, ‘রাইক্ষসের ক্ষিদা’, ‘রাধার বিবর্ণ অধ্যায়’ গ্রাম থিয়েটারের অনেক সহযোগি বন্ধু থিয়েটারগুলোতে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। নিজ দল শহীদ সমর থিয়েটার তাঁর রচিত প্রায় সব নাটকই মঞ্চস্থ করে দর্শকরসিকদের কাছে প্রশংসিত হয়ে আসছে। তিনি শহীদ সমর থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য, তারপর সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।
এছাড়ও তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর নিজের লেখা নাটক তথা জনপ্রিয় নাট্যকারদের নাটকে নিজে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং অভিনয় করেছেন। একজন বলিষ্ঠ মঞ্চ অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবে জামালপুর জেলা তথা বাংলাদেশে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। নাট্যকার হিসেবে তিনি যেমন সৃজনশীল, তেমনি নির্দেশক ও অভিনেতা হিসেবেও ছিলেন সমান দক্ষ।
মঞ্চের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। বিশেষ করে ‘গলুই’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও আঞ্চলিক অঞ্চলের থিয়েটারে গিয়ে নাটক নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। দীর্ঘ নাট্যজীবনে বহু সম্মাননা, পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট নাটকে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার তাকে ‘নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন’ পদক প্রদান করেন।
২০২৪ সালে মির্জা আজম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র–মাদারগঞ্জ তাকে ‘বীরমুক্তিযোদ্ধা ও গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু’ স্মৃতি পুরস্কার দেন। ২০০৫ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম গ্রামীণ নাট্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘বিশেষ সম্মননা পদক’ এবং পরবর্তীতে একই সংগঠন তাকে ‘নাট্যকার এস. এম হুদা স্মৃতি স্মারক সম্মাননা’ প্রদান করেন। ২০০৩ সালে গাইবান্ধা থিয়েটার তাকে ‘তুলসী লাহিড়ী পদক’ প্রদান করেন। এছাড়াও ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আয়োজিত কিউট নাট্যোৎসবে সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন। ১৯৮৯ সালে জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একাডেমি–জামালপুরের যৌথ নাট্যোৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ নাট্যকার’ হিসেবে পুরস্কার অর্জন করেন।
জামালপুরের লোকজ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, স্বরকলা, বৈশাখী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন–মেলান্দহ, জামালপুর সাহিত্য সংসদ, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা মাঠ কর্মচারী সমিতি–কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, শহীদ সমর থিয়েটার–মেলান্দহ, লালন একাডেমি–কুষ্টিয়া তাকে বিভিন্ন সময় ‘সম্মাননা স্মারক’ প্রদান করেন। তাঁর ষোলটি নাটক সমন্বয়ে নাটক সমগ্র–১, নাটক সমগ্র–২ ও রাধার বিবর্ণ অধ্যায় তিনটি নাটকগ্রন্থ রয়েছে। গ্রন্থগুলোর প্রকাশক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সমঝদার গীতিকবি ওবায়দুর রহমান বেলাল।
বাংলা নাট্যাঙ্গনে প্রান্তিক মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতাকে শিল্পরূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আসাদুল্লাহ ফারাজী এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর সৃষ্টিতে উঠে এসেছে মাটি ও মানুষের গল্প, সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও তিনি শিল্পচর্চার পথ থেকে সরে যাননি। নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা হিসেবে তিনি নিজস্ব মেধা, মনন ও জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পভাবনার মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
তাঁর সৃষ্টিকর্মে যেমন উঠে এসেছে মাটি ও মানুষের গল্প, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম। শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও অকুতোভয় মনোভাব তাঁকে বাংলা নাট্যজগতের এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ২০২৫ সালে কারাবন্দির সময়ে তাঁর ফুসফুসে দুরারোগ্য ব্যাধি (ক্যান্সার) বাসা বাঁধে। শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে তিনি বাঁচার লড়াই করে চলেছেন।
জি বি এম রুবেল আহম্মেদ : লেখক ও নাট্যকর্মী 


















