স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাররামরামপুর ইউনিয়নের ভাতখাওয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) প্রধান সড়ক থেকে ঝাউডাঙ্গা সড়ক সংযোগের মাঝে জিঞ্জিরাম নদীতে আজও স্থায়ী সেতু নির্মিত হয়নি।
ফলে দীর্ঘ দিন ধরে যাতায়াতে ব্যাপক দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন ঝাউডাঙ্গা, বালুরচর, পেরির চর, বানিয়াপাড়া ও ভাতখাওয়া এই পাঁচটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কে একটি সেতুর অভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে এখন তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।জিঞ্জিরাম নদীটি আকারে ছোট হলেও স্থানীয়দের যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি বেশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৬ জুন, মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী, কৃষক ও জনসাধারণ কাপড় উঠিয়ে নদী পার হচ্ছেন। শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলেও পারাপারের জন্য বাসিন্দাদের কোমর সমান পানি ভেঙে, কাপড় ভিজিয়ে বাধ্য হয়ে যাতায়াত করতে হয়। অন্যদিকে বর্ষায় নদীটি কানায় কানায় ভরে উঠলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একমাত্র ভরসা নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হয়। ফলে প্রায়ই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। ফলে থমকে আছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতি।
নদীর দুই পাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরপাড়ে রয়েছে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঝাউডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্প। অন্যদিকে, দক্ষিণপাড়ে রয়েছে মাদরাসা, বাঁশতলি বাজার এবং সড়ক ও জনপথের প্রধান সড়ক। এই পথ ব্যবহার করেই প্রতিদিন শত শত মানুষকে জেলা শহর জামালপুরসহ দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় যাতায়াত করতে হয়।
একটি সেতুর অভাবে নদীর উত্তরপাড়ের বালুর চর, পেরির চর ও ঝাউডাঙ্গা গ্রামের মানুষ আধুনিক চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা এবং নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল কেনাবেচা থেকে ব্যাপকহারে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভাতখাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কার্যকর কোন উদ্যোগ না থাকায় মানুষকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপারের আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা স্কুলেই আসতে চায় না।
ছাত্রনেতা ফাহাদ আল মাহমুদ এ প্রতিবেদককে বলেন, অবহেলার আঁধারে আর কতকাল থাকব? আমাদের প্রাণের দাবি একটি সেতু। বর্তমান যুগের আধুনিক আলোর মাঝেও যেন এক আদিম আঁধারে পড়ে আছি। যুগের পর যুগ ধরে শুধু আশ্বাসের বাণীই শুনেছি। কিন্তু এই এলাকার মানুষদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। কয়েকবার আশার আলো দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত মেলেনি একটি সেতু। আমাদের কষ্টগুলো আজ আর শুধু সমস্যা নয়। একেকটা বুকফাটা আর্তনাদ।
বালুরচর গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা কি শুধু ভোট দেওয়ার জন্যই জন্মেছি? কেন আমাদের এত অবহেলা? কোন জরুরি রোগী পরিবহন কিংবা কৃষিপণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে নৌকার উপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুইই দ্বিগুণ লেগে যায়।
স্থানীয় কৃষক মানিকজল মিয়া এ প্রতিবেদকেকে বলেন, নদীতে সেতু না থাকায় কষ্ট করে ফলানো ধান, পাট, ভুট্টা সময়মত বাজারে নিয়ে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছি না। এ ছাড়া অনেক সময় ছোট ছোট শিশুরা নদী পার হতে গিয়ে পানিতে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে উপজেলার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর তালিকা ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জহুরুল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। নদীর দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এবং দ্রুত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।
বিল্লাল হোসেন মন্ডল : নিজস্ব প্রতিবেদক, দেওয়ানগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 


















