দুই বছর আগে হাতে এসেছিল মাত্র তিনটি ছাগল। প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা আর পরিশ্রমে সেই তিন ছাগল এখন হয়েছে ১৫টি। নিজের পরিবারকে স্বাবলম্বী করার পর এবার সেই অর্জনের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন প্রতিবেশীর সঙ্গে। নিজের পাল থেকে একটি ছাগল প্রতিবেশীকে দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আমেনা বেগম।
শুধু আমেনা নন, জামালপুরে এমন ৩০০ পরিবারই নিজেদের অর্জন থেকে একটি করে ছাগল তুলে দিচ্ছে অন্য অসচ্ছল পরিবারের হাতে। ১৭ আগস্ট, সোমবার দুপুর ২টায় জামালপুরের ইজ্জতুননেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘প্রতিবেশীর সাথে সম্পদ হস্তান্তর ও আনন্দ সহভাগিতা অনুষ্ঠান-২০২৬’-এ এমন মানবিক চিত্র দেখা যায়। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জামালপুর এরিয়া প্রোগ্রাম ও উন্নয়ন সংঘ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জামালপুর জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্যাট আশরাফুল রাসেল। সম্পদ হস্তান্তর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার। এতে সভাপতিত্ব করেন উন্নয়ন সংঘের মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিচালক জাহাঙ্গীর সেলিম।
উন্নয়ন সংঘের জামালপুর এরিয়া প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক মিনারা পারভীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামালপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. শাহাদৎ হোসেন, ইজ্জাতুননেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শাহ্ আব্দুল্লাহ আল মুর্শেদ, প্রধান শিক্ষক আনিছুজ্জামান, রশিদপুর নগর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান আব্দুল্লাহ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সুবিধাভোগীরা নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প এবং প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

জানা গেছে, দুই বছর আগে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জামালপুর এরিয়া প্রোগ্রামের সহযোগিতায় ৩০০ পরিবারের প্রত্যেককে তিনটি করে ছাগল দেওয়া হয়। ছাগল পালনের পাশাপাশি পরিবারগুলোর সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে শাকসবজি উৎপাদন, পরিবারের আয় বাড়ানো, সন্তানদের পড়াশোনায় মনোযোগী করা, পারিবারিক সম্পর্ক ভাল রাখা এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে পরিবারগুলো নিজেদের উদ্যোগে ছাগল পালন ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধির কাজ শুরু করে। নিয়মিত পরিচর্যা ও বংশবৃদ্ধির ফলে অনেক পরিবারের তিনটি ছাগল বেড়ে এখন ১২ থেকে ১৫টি হয়েছে। আর স্বাবলম্বী হওয়ার পর সেই সম্পদ থেকেই একটি করে ছাগল তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবেশী অসচ্ছল পরিবারের হাতে।
দুই বছরের মধ্যে ওই ৩০০ পরিবার উৎপাদিত প্রাণিসম্পদ থেকে পাশের ৩০০ পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে ৮৪টি ছাগল, ৪৪৮টি মুরগী এবং ১৭০ হাঁস বিতরণ করেন।
জামালপুর পৌরসভা এবং সদর উপজেলার লক্ষ্মীরচর ও শরিফপুর ইউনিয়নে প্রতিবেশীর সাথে সম্পদ হস্তান্তর ও আনন্দ সহভাগিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জামালপুর পৌরসভার রশিদপুর গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম। দুই বছর আগে তিনটি ছাগল পাওয়ার পর নিয়মিত পরিচর্যা ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে তার পাল এখন ১৫টি ছাগলে দাঁড়িয়েছে। নিজের পরিশ্রমে অর্জিত সেই সম্পদ থেকে একটি ছাগল প্রতিবেশী সুরভী বেগমকে দিতে পেরে আনন্দিত আমেনা।
আমেনা বেগম বলেন, দুই বছর আগে ওয়ার্ল্ড ভিশনের মাধ্যমে আমি তিনটি ছাগল পেয়েছিলাম। যত্ন করে পালন করেছি। এখন আমার ১৫টি ছাগল হয়েছে। নিজের একটি ছাগল প্রতিবেশীকে দিতে পেরে আমি অনেক খুশি। আমি চাই, আমার কাছ থেকে পাওয়া ছাগলটি লালন-পালন করে সুরভীও একদিন স্বাবলম্বী হোক।
আমেনার কাছ থেকে ছাগল পাওয়া সুরভী বেগমের চোখেও এখন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। প্রতিবেশীর কাছ থেকে পাওয়া একটি ছাগলকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার শুরু হিসাবে দেখছেন তিনি। শুধু নিজের পরিবারের ভাগ্য বদল নয়, একদিন তিনিও অন্য কোন অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান।
সুরভী বেগম বলেন, আমার প্রতিবেশী ওয়ার্ল্ড ভিশনের মাধ্যমে তিনটি ছাগল পেয়েছিলেন। এখন তার ১৫টি ছাগল হয়েছে। তিনি আমাকে একটি ছাগল দিয়েছেন। আমিও চেষ্টা করব ছাগলটি যত্ন করে বড় করতে। একদিন যদি তার মত স্বাবলম্বী হতে পারি, আমিও আরেকজন গরিব মানুষকে সাহায্য করতে চাই।
আয়োজকেরা জানান, এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র পরিবারকে এককালীন সহায়তা দেওয়া নয়। বরং প্রশিক্ষণ ও সম্পদ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের আয় করার সক্ষমতা তৈরি করা। পাশাপাশি একজন সুবিধাভোগী যখন নিজের অর্জিত সম্পদ থেকে আরেকজনকে সহযোগিতা করেন, তখন সেই সহায়তা ছড়িয়ে পড়ে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে।
ফলে তিনটি ছাগল দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন শুধু ৩০০ পরিবারের স্বাবলম্বিতার গল্প নয়। বরং প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতারও উদাহরণ হয়ে উঠেছে। একসময় যারা অন্যের সহায়তার অপেক্ষায় ছিলেন, তারাই এখন অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছেন।
উন্নয়ন সংঘের পরিচালক (মানবসম্পদ) জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, আমরা শুধু সম্পদ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চাই না। মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই সম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। আজ একজন সুবিধাভোগী যখন নিজের অর্জন থেকে প্রতিবেশীকে একটি ছাগল দিচ্ছেন। তখন সেটিই আমাদের কাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য। একজনের হাতে দেওয়া সম্পদ আরেকজনের জীবনে আশার আলো জ্বালাবে। এটাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আখতার বলেন, মানুষকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার নিজের অবস্থার উন্নতি করে যখন আরেকটি পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তখন সমাজে সহযোগিতা ও মানবিকতার বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়। এই ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আশরাফুল রাসেল জামালপুর এরিয়া প্রোগ্রামের প্রশংসা করে বলেন, দরিদ্র মানুষ ছাগল, হাস, মুরগি সহায়তা পেয়ে দুই বছর লালন পালন করে অধিক উৎপাদন থেকে একটা অংশ পাশের দরিদ্র পরিবারের মাঝে দান করে অন্যন্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে। তিনি এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কামনা করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলারচিঠিডটকম 


















