ঢাকা ০৩:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেওয়ানগঞ্জে মরিচ চাষে কৃষকের মাথায় হাত

দেওয়ানগঞ্জ : মাইছানির চর এলাকায় মরিচ তুলছেন নারীরা। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে মরিচ চাষে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হওয়াতে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে।

কৃষকেরা জানান, ক্ষেত থেকে সংগ্রহীত মরিচ শুকানোর সময় বিরুপ আবহাওয়ার কারণে মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়। একই কারণে মরিচে ফুচকা পড়ে মরিচের এ ক্ষতি হয়েছে। তবে চাষের প্রথম থেকে শেষ অব্দি মরিচ চাষে আশাতীত লাভের প্রত্যাশা করেছিলেন উপজেলার চার হাজার ৫০০ মরিচ চাষি। মরিচ চাষের এই অপ্রত্যাশিত ক্ষতি সামলাতে চাষিদেরকে হিমশিত খেতে হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ৫২ হাজার ৮৬১ কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার ৫১১ ক্ষুদ্র, ২৫ হাজার ৫৯০ প্রান্তিক, দুই হাজার ৪৮৫ ভূমিহীন, দুই হাজার ২২৫ মাঝারি এবং ৫০টি বড় কৃষক পরিবার রয়েছে। জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৬১৮ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৮৮ হেক্টর।
চলতি বছর এ উপজেলায় ভূট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছয় হাজার ৯৩০ হেক্টর, মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫০ হেক্টর, ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত হাজার ৯১০ হেক্টর। এর মধ্যে ভূট্টায় অর্জন আট হাজার ৬২৫, মরিচ ৪৬০, ধান সাত হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

চাষিরা জানায়, সাধারণত আশ্বিন-কার্ত্তিক মাসে জমিতে মরিচ ছিটানো বা চারা রোপন করা হয়। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মরিচ পাকে। তখন গাছ থেকে মরিচ সংগ্রহ করে শুকাতে হয়। প্রতি বিঘা জমি থেকে ১০ থেকে ১২ মণ মরিচ ফলন হয়। এক বিঘা জমি মরিচ চাষে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। চলতি বছর বাজারে মরিচ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে এ অঞ্চলের চাষিরা মরিচ চাষে অধিক লাভবান হয়েছেন।

কিন্তু চলতি বছর মরিচ চাষের প্রথম থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। জ্বালানি তেল সংকট মরিচ চাষে তেমন প্রভাব ফেলেনি। ক্ষেত থেকে মরিচ তুলে শুকাতে দিলে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা দেখা দেয়। সে সময় বিরুপ আবহাওয়ায় ৪০ শতক মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়, ফুচকা পড়ে। সে কারণে রঙচটা ও ফুচকা পড়া নষ্ট হওয়া ওই মরিচ ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকার পরিবর্তে ছয় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মণ মরিচে চাষিদেরকে সাত হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হয়েছে চাষিদের।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, বিরুপ আবহাওয়ার জন্য এ অঞ্চলের ৪০ শতক মরিচের রঙ নষ্ট হয়েছে। সেই কারণে এ উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার মাইছানির চর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মহিলা শ্রমিকেরা ক্ষেত থেকে মরিচ তুলছেন।

মরিচ চাষি আবুল হোসেন বলেন, মরিচ চাষে ব্যয় ও পরিশ্রম উভয়ই বেশি। তবুও মৌসুম শেষে ফলন স্বাভাবিক হলে লাভের মুখ দেখা যায়। চরের জমি, মরিচ চাষের উপযোগী। কিন্তু এ বছর মরিচ শুকাতে দিলে আবহাওয়া খারাপ হয়। সে সময় চাষিদের মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয় ও ফুচকা পড়ে। নষ্ট হওয়া মরিচ পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে মরিচ চাষে বেশি আশাতীত লাভ পাচ্ছে না।

ফারাজীপাড়ার আনিছুর রহমান বলেন, তিন বিঘা জমিতে চলতি বছর মরিচের চাষ করেছিলাম। তাতে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। মরিচের ফলন দেখে প্রত্যাশা ছিল ৪০ থেকে ৪৫ মণ মরিচ পাব। ফলন বেশ ভালই হয়েছে। কিন্তু বিরুপ আবহাওয়ার জন্য ৪০ শতাংশ মরিচে রঙচটে গুণগতমানসহ ফুচকা পড়ে নষ্ট হয়ছে। সেই কারণে এ বছর মরিচ চাষে বিগত বছরগুলোর মত লাভ হবে না। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পোল্যাকান্দি মধ্যপাড়া গ্রামের চাষি আজিজুর রহমান বলেন, চরের জমি উর্বর হলেও বিঘা প্রতি ৪০ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবুও ভুট্টার পরিবর্তে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মরিচের চাষ করেছিলাম। ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু শেষের দিকে আবহাওয়া বিরুপ হওয়া মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়, ফুচকা পড়ে। সেই মরিচের বাজারে চাহিদা নেই। পাইকাররা ছয় হাজার টাকা মণ দরে মরিচ কিনছেন। ভাল মরিচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা দরে। সেই কারণে এ বছর মরিচ চাষে স্বাভাবিক মাত্রায় লাভের মুখ দেখছি না। আবহাওয়া বরাবর অনুকূলে থাকলে মরিচে এবার পর্যাপ্ত লাভ মিলত।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রতন মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, চলতি বছর মরিচের ফলন ভাল ছিল। বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল। সেচের জন্য জ্বালানির সংকট হয়নি। এরপরও ৪০ শতাংশ মরিচের ক্ষতি হয়েছে। পরিপক্ক মরিচ গাছ থেকে তুলে রোদে শুকাতে দিলে আবহাওয়া প্রতিকীলে চলে যায়। সেই সময় মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়। সেই কারণে ওই মরিচ অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের। চলতি বছর মরিচ চাষে এই উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেওয়ানগঞ্জে মরিচ চাষে কৃষকের মাথায় হাত

আপডেট সময় ০১:৫৫:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে মরিচ চাষে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হওয়াতে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে।

কৃষকেরা জানান, ক্ষেত থেকে সংগ্রহীত মরিচ শুকানোর সময় বিরুপ আবহাওয়ার কারণে মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়। একই কারণে মরিচে ফুচকা পড়ে মরিচের এ ক্ষতি হয়েছে। তবে চাষের প্রথম থেকে শেষ অব্দি মরিচ চাষে আশাতীত লাভের প্রত্যাশা করেছিলেন উপজেলার চার হাজার ৫০০ মরিচ চাষি। মরিচ চাষের এই অপ্রত্যাশিত ক্ষতি সামলাতে চাষিদেরকে হিমশিত খেতে হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ৫২ হাজার ৮৬১ কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার ৫১১ ক্ষুদ্র, ২৫ হাজার ৫৯০ প্রান্তিক, দুই হাজার ৪৮৫ ভূমিহীন, দুই হাজার ২২৫ মাঝারি এবং ৫০টি বড় কৃষক পরিবার রয়েছে। জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৬১৮ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৮৮ হেক্টর।
চলতি বছর এ উপজেলায় ভূট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছয় হাজার ৯৩০ হেক্টর, মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫০ হেক্টর, ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত হাজার ৯১০ হেক্টর। এর মধ্যে ভূট্টায় অর্জন আট হাজার ৬২৫, মরিচ ৪৬০, ধান সাত হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

চাষিরা জানায়, সাধারণত আশ্বিন-কার্ত্তিক মাসে জমিতে মরিচ ছিটানো বা চারা রোপন করা হয়। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মরিচ পাকে। তখন গাছ থেকে মরিচ সংগ্রহ করে শুকাতে হয়। প্রতি বিঘা জমি থেকে ১০ থেকে ১২ মণ মরিচ ফলন হয়। এক বিঘা জমি মরিচ চাষে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। চলতি বছর বাজারে মরিচ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে এ অঞ্চলের চাষিরা মরিচ চাষে অধিক লাভবান হয়েছেন।

কিন্তু চলতি বছর মরিচ চাষের প্রথম থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। জ্বালানি তেল সংকট মরিচ চাষে তেমন প্রভাব ফেলেনি। ক্ষেত থেকে মরিচ তুলে শুকাতে দিলে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা দেখা দেয়। সে সময় বিরুপ আবহাওয়ায় ৪০ শতক মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়, ফুচকা পড়ে। সে কারণে রঙচটা ও ফুচকা পড়া নষ্ট হওয়া ওই মরিচ ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকার পরিবর্তে ছয় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মণ মরিচে চাষিদেরকে সাত হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হয়েছে চাষিদের।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, বিরুপ আবহাওয়ার জন্য এ অঞ্চলের ৪০ শতক মরিচের রঙ নষ্ট হয়েছে। সেই কারণে এ উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার মাইছানির চর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মহিলা শ্রমিকেরা ক্ষেত থেকে মরিচ তুলছেন।

মরিচ চাষি আবুল হোসেন বলেন, মরিচ চাষে ব্যয় ও পরিশ্রম উভয়ই বেশি। তবুও মৌসুম শেষে ফলন স্বাভাবিক হলে লাভের মুখ দেখা যায়। চরের জমি, মরিচ চাষের উপযোগী। কিন্তু এ বছর মরিচ শুকাতে দিলে আবহাওয়া খারাপ হয়। সে সময় চাষিদের মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয় ও ফুচকা পড়ে। নষ্ট হওয়া মরিচ পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে মরিচ চাষে বেশি আশাতীত লাভ পাচ্ছে না।

ফারাজীপাড়ার আনিছুর রহমান বলেন, তিন বিঘা জমিতে চলতি বছর মরিচের চাষ করেছিলাম। তাতে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। মরিচের ফলন দেখে প্রত্যাশা ছিল ৪০ থেকে ৪৫ মণ মরিচ পাব। ফলন বেশ ভালই হয়েছে। কিন্তু বিরুপ আবহাওয়ার জন্য ৪০ শতাংশ মরিচে রঙচটে গুণগতমানসহ ফুচকা পড়ে নষ্ট হয়ছে। সেই কারণে এ বছর মরিচ চাষে বিগত বছরগুলোর মত লাভ হবে না। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পোল্যাকান্দি মধ্যপাড়া গ্রামের চাষি আজিজুর রহমান বলেন, চরের জমি উর্বর হলেও বিঘা প্রতি ৪০ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবুও ভুট্টার পরিবর্তে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মরিচের চাষ করেছিলাম। ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু শেষের দিকে আবহাওয়া বিরুপ হওয়া মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়, ফুচকা পড়ে। সেই মরিচের বাজারে চাহিদা নেই। পাইকাররা ছয় হাজার টাকা মণ দরে মরিচ কিনছেন। ভাল মরিচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা দরে। সেই কারণে এ বছর মরিচ চাষে স্বাভাবিক মাত্রায় লাভের মুখ দেখছি না। আবহাওয়া বরাবর অনুকূলে থাকলে মরিচে এবার পর্যাপ্ত লাভ মিলত।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রতন মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, চলতি বছর মরিচের ফলন ভাল ছিল। বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল। সেচের জন্য জ্বালানির সংকট হয়নি। এরপরও ৪০ শতাংশ মরিচের ক্ষতি হয়েছে। পরিপক্ক মরিচ গাছ থেকে তুলে রোদে শুকাতে দিলে আবহাওয়া প্রতিকীলে চলে যায়। সেই সময় মরিচের গুণগতমান নষ্ট হয়। সেই কারণে ওই মরিচ অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের। চলতি বছর মরিচ চাষে এই উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।