ঢাকা ০১:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নকলায় সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের সফলতা

নকলা : ব্যাপক ফলন হয়েছে সূর্যমুখীর। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

শেরপুরের নকলা উপজেলায় পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় ভোজ্য ও ওষধি তেলবীজ ফসল সূর্যমুখী চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। স্বল্প খরচ, কম শ্রম এবং অল্প সময়েই লাভজনক ফলন পাওয়ার কারণে কৃষকদের মধ্যে এই ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সূর্যমুখী চাষে প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।এখন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হলুদ রঙের সূর্যমুখী ফুলের খেত যেন নতুন সৌন্দর্যের বার্তা দিচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন এই ফুল দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করছেন কৃষকদের খেতে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, নকলার মাটি ও আবহাওয়া সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্বল্প সময়, কম খরচ ও নামমাত্র শ্রমে এই ফসল চাষ করে ভালো লাভ পাওয়া যায়। এজন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী করা হয়েছে।

চলতি রবি মৌসুমে উপজেলার ছয়টি ব্লকে ‘বাংলাদেশ চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)’ এর আওতায় সাতটি কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে লয়খা ব্লকে দুটি এবং চন্দ্রকোনা, চরমধুয়া, বাছুর আলগা, কাজাইকাটা ও চরভাবনা ব্লকে ৩৩ শতাংশ করে জমিতে একটি করে প্রদর্শনী করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসের বাস্তবায়নে প্রায় ২ হেক্টর জমিতে ৮ থেকে ১০ জন কৃষক-কৃষাণী সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তারা গত বছরের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এল.টি. সানফ্লাওয়ার-১ জাতের সূর্যমুখীর বীজ বপন করেন। বর্তমানে বেশিরভাগ খেতে ফুল ফুটেছে এবং কিছু খেতে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বীজ ধরেছে।

লয়খা গ্রামের কৃষক ফখরুল হাসান জানান, তিনি তার বাড়ির আঙিনার ৩৩ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। বীজের অবস্থা দেখে তিনি ভালো ফলনের আশা করছেন। তিনি বলেন, জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) মিন্টু খানসহ কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, আগে ওই জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়েছিল। পরে সেখানে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। এরপর আবার রোপা আমন বা পাট চাষ করা হবে। তবে ব্যাপকভাবে বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হলেও কিছুটা দ্বিধায় রয়েছেন।

একই এলাকার কৃষক সারোয়ার জাহান বলেন, কৃষি বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সূর্যমুখীর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শেরপুরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফারিহা ইয়াসমিন ও কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে মাঠ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

নকলা : ব্যাপক ফলন হয়েছে সূর্যমুখীর। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে এ প্রতিবেদককে বলেন, উপজেলায় পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ফসল চাষ করে অনেকে লাভবান হচ্ছেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। ফলন দেখে অন্য কৃষকরাও তাদের পতিত জমিতে তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোজ্যতেলের মধ্যে সূর্যমুখী তেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং লিনোলিক অ্যাসিড হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরলমুক্ত এই তেল শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল ওয়াহেদ খান এ প্রতিবেদককে বলেন, তিন মাস মেয়াদি এই ফসল চাষে কম খরচে ভাল লাভ পাওয়া যায়। নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে সারিবদ্ধভাবে বীজ বপন করা হয় এবং ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। সামান্য সার ও ২ থেকে ৩ বার সেচ দিলেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে বাজারজাতের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে কৃষকদের মধ্যে সূর্যমুখী চাষের আগ্রহ আরও বাড়বে। পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা এ প্রতিবেদককে বলেন, সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যসম্মত এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত ব্যবহারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নকলায় সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের সফলতা

আপডেট সময় ১০:৩৪:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

শেরপুরের নকলা উপজেলায় পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় ভোজ্য ও ওষধি তেলবীজ ফসল সূর্যমুখী চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। স্বল্প খরচ, কম শ্রম এবং অল্প সময়েই লাভজনক ফলন পাওয়ার কারণে কৃষকদের মধ্যে এই ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সূর্যমুখী চাষে প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।এখন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হলুদ রঙের সূর্যমুখী ফুলের খেত যেন নতুন সৌন্দর্যের বার্তা দিচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন এই ফুল দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করছেন কৃষকদের খেতে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, নকলার মাটি ও আবহাওয়া সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্বল্প সময়, কম খরচ ও নামমাত্র শ্রমে এই ফসল চাষ করে ভালো লাভ পাওয়া যায়। এজন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী করা হয়েছে।

চলতি রবি মৌসুমে উপজেলার ছয়টি ব্লকে ‘বাংলাদেশ চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)’ এর আওতায় সাতটি কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে লয়খা ব্লকে দুটি এবং চন্দ্রকোনা, চরমধুয়া, বাছুর আলগা, কাজাইকাটা ও চরভাবনা ব্লকে ৩৩ শতাংশ করে জমিতে একটি করে প্রদর্শনী করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসের বাস্তবায়নে প্রায় ২ হেক্টর জমিতে ৮ থেকে ১০ জন কৃষক-কৃষাণী সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তারা গত বছরের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এল.টি. সানফ্লাওয়ার-১ জাতের সূর্যমুখীর বীজ বপন করেন। বর্তমানে বেশিরভাগ খেতে ফুল ফুটেছে এবং কিছু খেতে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বীজ ধরেছে।

লয়খা গ্রামের কৃষক ফখরুল হাসান জানান, তিনি তার বাড়ির আঙিনার ৩৩ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। বীজের অবস্থা দেখে তিনি ভালো ফলনের আশা করছেন। তিনি বলেন, জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) মিন্টু খানসহ কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, আগে ওই জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়েছিল। পরে সেখানে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। এরপর আবার রোপা আমন বা পাট চাষ করা হবে। তবে ব্যাপকভাবে বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হলেও কিছুটা দ্বিধায় রয়েছেন।

একই এলাকার কৃষক সারোয়ার জাহান বলেন, কৃষি বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সূর্যমুখীর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শেরপুরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফারিহা ইয়াসমিন ও কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে মাঠ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

নকলা : ব্যাপক ফলন হয়েছে সূর্যমুখীর। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে এ প্রতিবেদককে বলেন, উপজেলায় পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ফসল চাষ করে অনেকে লাভবান হচ্ছেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। ফলন দেখে অন্য কৃষকরাও তাদের পতিত জমিতে তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোজ্যতেলের মধ্যে সূর্যমুখী তেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং লিনোলিক অ্যাসিড হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরলমুক্ত এই তেল শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল ওয়াহেদ খান এ প্রতিবেদককে বলেন, তিন মাস মেয়াদি এই ফসল চাষে কম খরচে ভাল লাভ পাওয়া যায়। নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে সারিবদ্ধভাবে বীজ বপন করা হয় এবং ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। সামান্য সার ও ২ থেকে ৩ বার সেচ দিলেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে বাজারজাতের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে কৃষকদের মধ্যে সূর্যমুখী চাষের আগ্রহ আরও বাড়বে। পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা এ প্রতিবেদককে বলেন, সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যসম্মত এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত ব্যবহারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।