আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের একজন শীর্ষস্থানীয় অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবদুল্লাহ আল-হারুন (জন্ম. ১০ই অক্টোবর ১৯৪৫)। সম্প্রতি তিনি আশি বছর অতিক্রম করলেও তাঁর লেখালেখির তৎপরতার মূল্যায়ন কমই হয়েছে। এ কথাটা অন্তত প্রাথমিকভাবে ঠিক। বাংলাদেশে তিনি কার্যকর না-থাকায় এবং এদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ধারায় সরাসরি সজীব-সক্রিয় না-হওয়ার কারণে তার লেখা বইপত্র নিয়েই মানসম্মত আলোচনা-পর্যালোচনা হয়নি। আমরা কয়েকজন ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিওতে তাঁর কাছাকাছি আসার ও তাঁর সঙ্গে একত্রে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। বর্তমান প্রবন্ধকার তার প্রকাশিত বইপত্র নিয়ে আলোচনার সূচনা করেন।
এ প্রসঙ্গে লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আসিফ হাসান নবীর নাম স্মরণীয়। তিনিই আবদুল্লাহ আল-হারুনের প্রণীত লেখা সম্পাদনা করে গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। নিঃসন্দেহে আবদুল্লাহ আল-হারুনকে নিয়ে আরো আলোচিত হতে পারত। তাঁর লেখালেখি ও কর্মতৎপরতার অন্যতম দিক হলো ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ, মৃত্যুবিষয়ক গবেষণা , হসপিস ও প্যালিয়েটিভ ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলা ভাষায় তার কয়েকটি বই রয়েছে যা বেশ বিরল ঘটনা। তার লেখা আত্মকথা ও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও অনন্য। বাংলা ভাষায় মৃত্যু ও মৃত্যুসঙ্গ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও রচনার পথিকৃৎ তিনি। তার লেখালেখির বিশাল জগৎ জুড়ে রয়েছে আত্মজৈবনিক রচনা ও স্মৃতিকথাভিত্তিক প্রবন্ধ।
২০০৮ সালে তাঁর প্রথম বই ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ প্রকাশিত হলে সাহিত্য-বোদ্ধামহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়। গ্রন্থটি ব্যাপক পাঠক-প্রিয়তা পায়। বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে অনেক গ্রন্থ। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- যেমন- ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে’ (২০০৯), ‘হৃদয় মিশেছে মৃত্তিকায়’ (২০১০), ‘অঙ্গবিহীন আলিঙ্গন’ (২০১০), ‘হৃদস্পন্দন আশা হয়ে বাজে‘ [অনুবাদ] (২০১১), ‘মৃত্যু ; একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা’ (২০১১), ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন : মহান রূপরেখা’ [অনুবাদ] (২০১৬), মৃত্যুসঙ্গীর দিনলিপি (২০১৭), রাজদর্শন (২০১৯), ‘বেলভদ্রের বিনোদিনী’ (২০১৯), ‘বিটবুর্গ রহস্য’ (২০২৪), ‘হাইদি’ [অনুবাদ] (২০২৪) প্রভৃতি।
আবদুল্লাহ আল-হারুন গত প্রায় ষাট বছর ধরে জার্মান প্রবাসী। আমরা মনে করি বাংলা ভাষায় মৃত্যু ও মৃত্যুসঙ্গ বিষয়গুলোর জন্য তিনি সবসময়েই একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে বিবেচিত হবেন। বর্তমান নিবন্ধে আমরা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই ‘কিংবদন্তি নাট্যকার : আবদুল্লাহ আল-মামুন’শীর্ষক বই নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস করেছি। লেখক ও অনুবাদক আবদুল্লাহ আল-হারুন তার সহোদর অগ্রজ মামুন সম্পর্কে ‘কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুন’ গ্রন্থে তিনি যে স্মৃতিকথা তুলে ধরেছেন তা সেই সময়কে ধরেই। সেই সময়কে জানা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে তিনি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুনের স্মৃতিরক্ষাসহ তার কর্মময় জীবনী তুলে এনেছেন। তারা পিঠাপিঠি ভাই, একসাথে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে নানা সংঘাত, সংকট, অভাবের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। এ গ্রন্থে লেখকে এ বিষয়গুলো অকপটে তুলে ধরেছেন।
বইয়ের নাম : কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুন
লেখকের নাম : আবদুল্লাহ আল-হারুন
সম্পাদনা : আসিফ হাসান নবী
শ্রেণি : স্মৃতিচারণমূলক জীবনী
মূল্য : ৮৫০ টাকা
প্রকাশক : গল্পকার
প্রকাশকাল : জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আবদুল্লাহ আল-হারুন তার ‘কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুন’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন : “বাংলাদেশের নাট্য জ্যোতিষ্ক প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুন আমার সহোদর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তার জীবনের কিছু বিচিত্র ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিছু কাহিনি লেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। এসব সাধারণত পরিবারে বাইরে কেউ জানে না এবং জীবনের মূল ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট না হবার দরুন, জীবনী লেখকদের লেখার বিষয়ের বহির্ভূত থাকে। এখানে প্রধান সমস্যাটি হলো আমি সেই ১৯৭৭ সাল থেকে দেশছাড়া। মামুন যখন গত শতাব্দীর আশির দশকে ধীরে ধীরে তার খ্যাতির তুঙ্গে উঠছে এবং তারপর তার মৃত্যু-অবধি প্রায় তিরিশ বছর ধরে ক্রমেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠছিল, সেই সময়টাই আমি দেশের বাইরে। ১৯৮৩ সালে জার্মানিতে দুবার এবং ২০০৫ সালে একবার লন্ডনে তার সঙ্গে আমার অল্প কয়েকদিনের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাহলে তার জীবনী কী করে লিখব? হঠাৎ একদিন মনে হলো, শৈশবে আমরা দুই পিঠাপিঠি ভাই যেভাবে একসাথে স্কুলে গিয়েছি, রাতে এক চৌকিতে একসাথে শুয়ে ঘুমিয়েছি, ঘুমানের আগে কতরকম গল্পসল্প করেছি, ফিসফাস করে কথা বলতে হতো। বাঁশের বেড়া আর টিনের ঘর। সাউন্ড প্রুফ কী তা তখনও জানি না। বাবা-মা শুনে বিরক্ত হয়ে ধমক দেন বা পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে, চড়চাপটাও মারেন, এই আশঙ্কায় গলা একদম নিচু করে কথা বলতাম। গায়ের চাদরের নিচে হারিকেনের স্বল্প আলোতে একই গল্পের বই দুজনে একসাথে পড়েছি। দিনে এক গল্পের বই ভাগাভাগি করে পড়েছি, সেই কথাগুলিই না কেন তার যারা ভক্ত, জীবিতদের সংখ্যা এখনও অনেক, তাদের কাছে তুলে ধরি?
মামুন তো আর একদিনে বিখ্যাত হয়নি। অনেক চড়াই-উতরাই, উত্থান-পতন, খ্যাতি-অখ্যাতি, বাধাবিপত্তি, প্রশংসা-স্বীকৃতি আর সমালোচনার পথ তাকে পার করতে হয়েছে। ১৯৭৭ সালে আমার দেশত্যাগ-অবধি তাকে তো আমি খুব কাছে থেকেই সব সময় দেখেছি। ঢাকায় আমি ১৯৭৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে থাকতাম। ওর বাসা ছিল সিদ্ধেশ্বরী এবং আমি থাকতাম চামেলিবাগে। ৩-৪ মিনিটের হাঁটার রাস্তা। গরমের দিনে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেই ওর বাসায় বহুবার গিয়েছি। খালি পায়েও গিয়েছি।”
বইটিতে আবদুল্লাহ আল মামুনের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে প্রাঞ্জল ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা রয়েছে। পাঠক অনেক অজানা তথ্য পাবেন এ গ্রন্থে। এ বইয়ের শেষের দিকে স্থান পেয়েছে কিছু ছবি, স্মারক, শিল্পকর্মের তালিকা যা প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বইটির মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে। বইটির অঙ্গসৌষ্ঠব অসাধারণ। বইয়ের প্রচ্ছদ ও বাধাঁই এবং বইয়ের বাহ্যিক দর্শনে একটা ধ্রুপদি আমেজ রয়েছে। বইটিতে ১৮টি পরিচ্ছেদে মোট ২৭০ পৃষ্ঠার মধ্যে আবদুল্লাহ আল মামুনের জীবন ও কর্মকে লেখক তুলে এনেছেন। লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুন তার এই অসামান্য বইটি বাংলাদেশে তার দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের অনুজপ্রতিম ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশিষ্ট লেখক, সম্পাদক, প্যালিয়েটিভ কেয়ার গবেষক ও সমালোচক আসিফ হাসান নবীকে উৎসর্গ করেছেন।
আবদুল্লাহ হারুনের ‘কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুন’ কেবল স্মৃতিকথা নয়, সময়ের দলিল। অসামান্য লেখক, টিভি প্রযোজক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যশিক্ষক, ঔপন্যাসিক ও সংগঠক আবদুল্লাহ আল-মামুন সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লিখতে গেলে পড়তে গেলে আবদুল্লাহ আল-হারুনের এই গ্রন্থ সহায়ক হতে পারে।
বিশ শতকের ষাট-সত্তর দশকের শিল্পসাহিত্য, আর্থ-সামাজিক হালতক, সমাজ পরিবর্তন প্রভৃতি সম্পর্কে জানতেও এ বই সহায়ক হবে। কেননা, লিখিত ইতিহাসের উপদান সরকারি নথিপত্র, রেকর্ড, গেজেট প্রভৃতি হলেও স্মৃতিকথাকে অস্বীকার করা যায় না। আর এ কথা বার বার উচ্চারিত হয় যে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসই জাতীয় ইতিহাসের অংশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, লেখক ও অনুবাদক আবদুল্লাহ আল-হারুনের ‘কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুন’ গ্রন্থটি এদেশে নাট্যকার মামুনচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে বিবেচিত হবে। গ্রন্থটির জন্য লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুন বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক।
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : গবেষক ও প্রাবন্ধিক। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি 


















