বাংলাদেশে ভুল ও জাল জন্মনিবন্ধন (False Birth Registration) শিশু সুরক্ষার একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বয়স, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার পরিচয় ও জন্মস্থানের ভুল তথ্য শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। শিশু পাচার ও অভ্যন্তরীণ শিশু যৌন শোষণ (CST) প্রতিরোধে এই সমস্যা অবিলম্বে সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা অপরাজেয়-বাংলদেশ।
এ লক্ষ্যে অপরাজেয়-বাংলাদেশ “দি ফ্রিডম ফান্ডের” অর্থায়নে “বাংলাদেশের যৌন নির্যাতন ও পাচারের শিকার শিশুদের সুরক্ষা বৃদ্ধি” শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।
বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন না থাকা শিশুদের জন্য ভুয়া বা অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হচ্ছে। স্থানীয়পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, প্রশিক্ষণহীনতা এবং “অপ্রাপ্য (Oprappo)” অপশনের ভুল বা সীমিত ব্যবহারের কারণে এই অনিয়ম আরও বাড়ছে। ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় সার্ভার জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্বও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।
জন্মনিবন্ধন জটিলতার কারণে দেশের অনেক শিশুর জীবনের সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এমন এক কন্যাশিশুকে তার স্বাভাবিক জীবন থেকে আজ যৌনকর্মী হয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটাতে হচ্ছে। ওই কন্যাশিশুটি জীবনের সত্য ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অন্ধকার জগতের নেতিবাচক পরিস্থিতি। অঞ্জনা (ছদ্মনাম) নামের ওই কন্যাশিশুটি বরিশাল জেলার ছোট্ট একটি গ্রামের চকিদার বাড়ির অসহায় হতদরিদ্র পরিবারের এক দুরন্ত বালিকা। প্রায়ই না খেয়ে দিন পার করতে হতো তাদের ১২ জন সদস্যের পরিবারের।
ছোট্ট অঞ্জনা ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না পেরে একদিন বাড়ি ছেড়ে লঞ্চে করে বড় বোনের বাসায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। লঞ্চে একজন নারীর সাথে পরিচয় হয় এবং সে তার কষ্টের জীবনের কথা শেয়ার করে। তখন সেই নারী চাকরির কথা বলে ঢাকায় তার বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর তার সাথে গামেন্টস ফ্যাক্টরিতে অঞ্জনাকে চাকরি দেয়। অঞ্জনা একমাস চাকরির পর তার বোনের সাথে দেখা করতে যায়। সেখানে আশ্রয়ের জন্য গেলে তার বোন তাকে রাখতে রাজি হয় না। কারণ তারই সংসার চলে না। তাই অঞ্জনাকে বাড়ি চলে যেতে বলে। সেখান থেকে বাড়িতে না গিয়ে ওই নারীর সাথে পুনরায় চাকরি করতে থাকে। ওই নারী সুযোগ বুঝে বেড়ানোর কথা বলে তার স্বামীসহ জামালপুরের যৌনপল্লীতে এক সর্দারনীর কাছে অঞ্জনাকে বিক্রি করে দেয়।
সেখানে গিয়ে দেখে বিভিন্ন বয়সের অনেকগুলো নারী বস্ত্রহীন। আবার কেউ বা অর্ধবস্ত্র অবস্থায় বিভিন্ন অঙ্গ-ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক পুরুষ যাওয়া আসা করছে। এটা দেখে ভয় পেয়ে যায় অঞ্জনা। তাৎক্ষণিক অঞ্জনা পালাতে চাইলে একজন সর্দারনী তাকে আটকে দেয় এবং অনেক বোঝায়। কিন্তু অঞ্জনা রাজি না হলে সর্দারনী তাকে বলে আমি তোকে কিনে নিয়েছি। আমি যা বলবো তুই তা করতে বাধ্য।
ওই সময় তার বয়স ছিল ১১ বছর। প্রশাসনিক বিভিন্ন চাপের কারণে লাইসেন্সবিহীন অঞ্জনাকে রাখতে পারেনি সর্দারনী। যার কারণে তিন বছর আলাদা একটা বাড়িতে ঘরবন্দি করে রাখে অঞ্জনাকে। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনও করে। স্বাবালিকা হওয়ার পর ১৪ বছর বয়সে বয়স বাড়িয়ে ১৮ বছর বয়স দেখিয়ে লাইসেন্স করে জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করে। যার জন্মনিবন্ধন বা এনআইডি কার্ড কোন ডকুমেন্টস অঞ্জনার কাছে দেওয়া হয়নি বা দেখানো হয়নি। যে কারণে তার জীবন জীবিকার মূল উৎস করে দেওয়া হয় যৌনকর্ম। এই ভয়াবহ অবস্থার ভিত্তিতে সে পরিণত হয় যৌনকর্মী হিসেবে।
এদিকে ওই অসহায় কন্যাশিশু অঞ্জনাসহ এমন অনেক শিশুদের বিষয়ে অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে আসে করুণ জীবন কাহিনী। যেসব কারণে ভুল জন্মনিবন্ধনের কারণে নাগরিক অধিকার পেতে এমন অনেক শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা ও জটিলতা দেখা সেগুলো হলো- জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাচার ও শোষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আইনি সহায়তা ও কেস ম্যানেজমেন্টে জটিলতা তৈরি হয়। বয়সভিত্তিক সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় না। বিশেষত CST- এর শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক জন্মনিবন্ধন না থাকায় পুনরায় শোষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষায় অপরাজেয়-বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সুপারিশ তৈরি করে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহবান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, অপ্রাপ্য শিশুদের সর্বোত্তম সুরক্ষার জন্য ১. জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে শিশুবান্ধব ও সারভাইভার-সেনসিটিভ করতে হবে। ২. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও রেজিস্ট্রারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ৩. অপ্রাপ্য (Oprappo) অপশনের ব্যবহার সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন। ৪. সামাজিক সুরক্ষা, রেফারেল সেবা ও জন্মনিবন্ধনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অপরাজেয় বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে বাস্তব যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো : ১. জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতি রোধে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা। ২. যেকোনো সংশোধনের জন্য বাধ্যতামূলক হলফনামা ও ডকুমেন্টারি যাচাইকরণ। ৩.ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ফি মওকুফ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিতকরণ। ৪. কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ। এবং ৫. সরকার ও এনজিও সমন্বয়ে রেফারেল ও ফলোআপ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা দরকার।
সংস্থাটির মতে, সঠিক জন্মনিবন্ধনই হলো শিশুর পরিচয়, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ভিত্তি। ভুল জন্মনিবন্ধন বন্ধে অবিলম্বে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সময়।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বাংলারচিঠিডটকম 



















