বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী সিয়াম আহমেদ। আন্দোলনের শুরু থেকেই ন্যায়ের পক্ষে মাথা উঁচু করে সোচ্চার হন প্রতিবাদে-বিক্ষোভে, মিছিলে-মিটিংয়ে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের নিজ এলাকায় গড়ে তুলে দুর্বার আন্দোলন।
সব বাঁধা উপেক্ষা করে জুলাই যুদ্ধে সফল হলেও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলায় সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও ভাঙা হাতে লাগানো প্লেট বয়ে বেড়াচ্ছেন সিয়াম। প্রায়ই যন্ত্রণায় কাতরান। তবু তার চোখে নেই কান্না, নেই হাহাকার। প্রত্যাশা একটাই তিনি যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
জুলাই যোদ্ধা সিয়াম আহমেদ জামালপুরের মাদারগঞ্জ পৌরসভার জোনাইল বাজার এলাকার শিক্ষক ইমান আলীরছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সিয়াম সবার ছোট। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা সিয়াম খুবই মেধাবী ছাত্র। তিনি জোনাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.২৮ ও ২০১৭ সালে উজডম সেন্টাল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৪২ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২২ সালে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স শেষে এবং একই কলেজে বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, রবিবার সকালে থেকেই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী বাজার, হাইস্কুল মোড় ও উপজেলা চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। সেদিন দুপুরে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে লাঠি-সোঠা নিয়ে হামলা চালায় উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশও ফাকা গুলি ছোঁড়ে। এ হামলায় সম্মুখসারির যোদ্ধা সিয়াম আহমেদকে কয়েকদফা পিটিয়ে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করে এবং বাম হাত পিটিয়ে ভেঙে দেয়। এ ঘটনায় আরও বেশকয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয় এবং অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে হামলাকারীরা।
আহত সিয়ামকে উদ্ধার করে স্থানীয় ও জেলা শহরের কয়েকটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে তারা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে জামালপুর শহরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে গোপনীয়তার সাথে সিয়ামকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে আনা হয়। সরকার পতনের পর সিয়ামের অবস্থা আরও অবনতি হলে তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাম হাতে প্লেট ও স্ক্রু লাগানো হয়। এরপর টানা ১২দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফিরেন তিনি।
আহত সিয়াম আহমেদ বলেন, সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। বাম হাতে অপারেশনের মাধ্যমে প্লেট ও স্ক্রু বসানো হয়েছে। যা দুই বছর পুনরায় অপারেশন করে অপসারণ করতে হবে। শরীরের ১৭ জায়গায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি। কোন কাজকর্ম করতে পারছি না। ভালভাবে লেখাপড়াও করতে পারছি না। এদিকে আমার পরিবারের অবস্থাও ভাল না। সবদিক থেকে খুব চিন্তায় আছি। তবে আমি সুস্থ হয়ে পড়াশোনা করতে চাই। মা-বাবার স্বপ্নটা পূরণ করতে চাই। আমার চিকিৎসায় ৬০-৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখনও নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে। আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু টাকা ও জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকার পেয়েছি। আর কোন সহযোগিতা পাইনি। গুরুতর আহত হওয়া সত্বেও আমাকে জুলাইযোদ্ধার তালিকায় সি-ক্যাটাগরিতে দেখানো হয়েছে। ক্যাটাগরি পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেও কোন সাড়া পাচ্ছি না।
জামালপুর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য আরিফুল ইসলাম বলেন, মির্জা আজমের নিজ এলাকায় আন্দোলন করা সহজ বিষয় ছিল না। তবও ছাত্র-জনতা জীবনের মায়াত্যাগ প্রতিদিন বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্র-জনতার উপর নৃশংসভাবে হামলা চালায়। সিয়ামের উপর কয়েকদফা আক্রমণ করে সারা শরীর পিটিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে এবং বাম হাত ভেঙে দেয়। তিনি আহত সিয়ামের সু-চিকিৎসা এবং অনতিবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান।
খাদেমুল ইসলাম : নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 



















