জামালপুরের ইসলামপুর বাজার রেলস্টেশন থেকে যাতায়াতকারী ট্রেনযাত্রীদের প্রতিদিন বিড়ম্বনার শিকার হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ঈদের আগে পিছে পরিস্থিতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইসলামপুর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রেনযাত্রী যাতাযাত করে থাকেন। তাই আন্তঃনগর ট্রেনের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় অধিকাংশ যাত্রীকে আসনবিহীন টিকিট নিয়ে বাঁদুরঝোলা হয়ে যাতায়াত করতে হয়।
দুর্ভোগ লাঘবে আরও নতুন দু’টি আন্তঃ নগর ট্রেন সংযোজন দাবি জানালেও অধ্যবদি কোন প্রতিকার মেলেনি। অন্যদিকে ৪-৫ গুণ বেশি দিয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনতে হিমশিম খেতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।
সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চার লেনে উন্নয়ন ঘটলেও ইসলামপুরে সড়কপথ মান্ধাতা আমলেই রয়ে গেছে। সড়ক নানা স্থানে যেমনি আঁকা বাঁকা, ঠিক তেমনি সরু। দু’টি গাড়ি অতিক্রম করা খুবই দুষ্কর। তাই এ অঞ্চলের মানুষ উপায়হীন হয়ে রেল ভ্রমণকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ঢাকা- জামালপুর- দেওয়ানগঞ্জ রেলপথে বর্তমানে আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস, আন্তঃনগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস, কমিউটার(১) ও কমিউটার (২) ট্রেন চলাচল করে আসছে। প্রতিদিন ট্রেনের আসনের চেয়ে দ্বিগুণ টিকিট বিক্রি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে রেল সেবার কোন উন্নতি হয়নি। ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জ মাত্র ২১২ কিলোমিটার রাস্তা হলেও ট্রেনে গতি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার। সময় লাগে ন্যুনতম প্রায় ৭ ঘন্টা। ১৯৮৫ সালের দিকে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পর ঢাকা-বাহাদুরাবাদ ঘাটে চলাচলে তখন সময় লাগত মাত্র চার ঘন্টা। বর্তমানে দ্বিগুণ সময় অর্থাৎ সাত ঘন্টা সময় লাগে। এত বেশি সময় লাগার কারণ কি? এ বিষয়ে রেললাইন ইঞ্জিনিয়ারিং দায়িত্ব প্রাপ্তদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানায় লাইন অত্যন্ত দুর্বল। তাই ট্রেন দুর্ঘটনা এড়াতে ধীর গতিতে চলে।
অপরদিকে রেল সূত্র আরও জানায়, ২০১৪ সালে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় ১০৪ কিলোমিটার রেল লাইনসহ কংক্রিট স্লিপার বসিয়ে নতুন লাইন নির্মাণ করা হলেও তবুও লাইন দুর্বল ? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোন সদুত্তর মেলেনি তাদের কাছে। এদিকে ট্রেনগুলো যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও সেবার বালাই নেই।
আন্তঃনগর ট্রেনের প্রথম শ্রেণির চেয়ার কোচসহ আশপাশের কোচগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে টয়লেট অকেজো। অধিকাংশ কোচের ১৪টি বাতির স্থলে রয়েছে মাত্র ২/৪টি বাতি। কমিউটার ট্রেনে টয়লেট থাকলেও পানির ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। যাত্রীদের যাতায়াতের দুর্বলতাকে জিম্মি করে এ যেন কর্তৃপক্ষের দায়সারা ব্যবসা। এছাড়াও কোচে রয়েছে হকার ও হিজড়াদের উপদ্রব। হিজড়ারা পুরুষের সাথে মহিলা যাত্রী বসা দেখলে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলে অশালীন আচরণসহ নোংরা মন্তব্য করে থাকেন। অপরদিকে সুলভ শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণির কোচগুলোতে ভয়ানক রোগাক্রান্ত নোংরা ভিক্ষুকেরা যাত্রী সাধারণের উপর যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, হকারসহ খাবার গাড়ির পঁচা-বাসি খাবার বিক্রি করছে দেদারছে। শুধু তাই নয়, রেলওয়ে কিছু সংখ্যক অসাধু ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মদদে টিকিটবিহীন আসন পাইয়ে দিতে চলে রমরমা বাণিজ্য। যাত্রীবাহী ট্রেনের ছাদ থেকে প্রতি বছর ডাকাতের কবলে পড়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ছিনতাইকারী অথবা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে অনেকেরই সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। প্রায়ই অনেকের মরহেদ ট্রেনের ছাদে কিংবা রেল লাইনের ধারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বর্তমানে ট্রেনগুলোতে যেন অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। যেন দেখার কেউ নেই।
রেলওয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এ রুটের প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করে থাকে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, কমলাপুর থেকে ট্রেন ছাড়ার আগে এবং পরে ছিনতাইকারী এমনকি অজ্ঞান পার্টির লোকজন ট্রেনের মধ্যে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে চম্পট দেয়। রেলওয়ে আইন শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে কোন প্রতিকার পায়নি যাত্রীসাধারণ। এছাড়াও ৪-৫ গুণ বেশি দিয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনতে হয়। এসবের জন্য রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারীতাকে দায়ী করেছেন সচেতন যাত্রী সাধারণ। অসাধুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ আরও দু’টি আন্তঃ নগর ট্রেন সংযোজন করা হয় তাহলেই দুর্ভোগ লাঘব হবে বলেও মনে করেন যাত্রী সাধারণ ও এই অঞ্চলের মানুষ।
ইসলামপুর বাজার রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার শাহিন মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, এই রুটে বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও কমিউটার তিনটি ট্রেন চলছে। এতে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত এ অঞ্চলের মানুষের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। সঠিক সময় ট্রেন চলাচলসহ আরও নতুন দু’টি আন্তঃ নগর ট্রেন সংযোজন করা হলে যাত্রীর পরিমাণ যেমন বৃদ্ধি পাবে। ঠিক তেমনি সরকারে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করি।
লিয়াকত হোসাইন লায়ন : নিজস্ব প্রতিবেদক, ইসলামপুর, বাংলারচিঠিডটকম 

















