জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় সেতু না থাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা নড়বড়ে একটি বাঁশের সাঁকো। উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নে নাংলা বাধের মাথা এলাকায় যমুনার শাখা নদীতে সেতু না থাকায় ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁশের সাঁকো দিয়ে মাদারগঞ্জ ও সারিয়াকান্দি এই দুই উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৫ গ্রামের মানুষকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন বৃদ্ধ, নারী, শিশু, রোগী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় কৃষকেরা চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
এদিকে, সেতু না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স যেতে পারে না ওইএসব এলাকায়। ফলে মুমূর্ষু রোগী ও গর্ভবতী নারীরা পড়ছেন বিড়ম্বনায়। দীর্ঘদিনেও জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে সেতু নির্মাণ না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দেড় যুগের বেশি সময় ধরে নাংলা বাধের মাথা এলাকায় একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচন এলে স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কোন উদ্যোগ নেন না। বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের কাছে ঘুরেও সেতুর বিষয়ে মিলছে না কোন সমাধান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নে যমুনার একটি শাখা নদী নাংলা, নাদাগাড়ী, পশ্চিম সুখনগরীসহ ১৫টি গ্রামকে আলাদা করেছে। ওইসব গ্রামের মানুষ ওই নদীটি প্রথমে নৌকা দিয়ে পারাপার শুরু করে। পরে এলাকাবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে। এরপর থেকে এ সাঁকো দিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নের নাংলা, নাদাগাড়ী, পশ্চিম সুখনগরী, জোড়খালী ইউনিয়নরে ফুলজোড়, কাইজের চর, আতামারী, বগুড়ার সারিয়াকান্দী উপজেলার কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের শুনপচা, নান্দিনা চর, ডাকাতমারী, বোহাইল ইউনিয়নের ধারাভর্ষা, শংকরপুর, জাওনের চরসহ ১৫ গ্রামের মানুষ পারাপার হচ্ছে। সেতুর অভাবে কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন দিকে পিছিয়ে পড়ছে ওই অঞ্চলের দরিদ্র মানুষগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, নাংলা বাধের মাথা এলাকায় যমুনার শাখা নদীর উপর নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁশের সাঁকোটি। নড়বড়ে সাঁকোটি পার হতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে বৃদ্ধ, নারী, রোগী ও শিশুদের। সাঁকোর উভয় পাশে রয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও মসজিদ। কয়েক বছর আগে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়। সাঁকোটির পাটাতনের কাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। কাঠ ভেঙে অনেক স্থানে ফাঁকা হয়ে আছে। বৃষ্টির পানিতে কাঠ ও বাঁশে পচন ধরেছে। লোকজন চলাচলে সময় সাঁকোটি দুলতে থাকে।

এরপরও প্রতিদিন দুইপাড়ের প্রায় ১০ হাজার মানুষ ওই ভাঙা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে নদীর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করলেও বর্ষায় দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
নাংলা এলাকার তোফায়েল আহমেদ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না থাকায় এই এলাকায় মানুষ আত্মীয় করতে চায় না। আর কত কষ্ট করবে এই এলাকার মানুষ? আমরা আর কিছু চাই না, এখানে একটা সেতু চাই।
স্টুডেন্ট কেয়ার হাইস্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীম আহমেদ জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ এ সাঁকোটি পারাপার হতে তাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় পা পিছলে পানিতে পড়ে বইপত্র নষ্ট ও আহত হয়েছে শিক্ষার্থীরা।
ফুলজোড় এলাকার কৃষক মাজেদুল ইসলাম বলেন, সেতু না থাকায় এ অঞ্চলের কৃষক তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সঠিক সময়ে বাজার নিতে পারে না। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। এখানে একটি সেতু হলে কৃষকদের খুব উপকার হবে।
বালিজুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মুসা বলেন, একটি সেতুর অভাবে ১৫টি গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষকে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ বাঁশের সাঁকোর ছাড়া ওই অঞ্চলের মানুষকে প্রায় ৫-৭ কিলোমিটার পথ ঘুরে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। সেতু নির্মাণ হলে এলাকাবাসীর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে।
এলজিইডির মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া তমাল এ প্রতিবেদককে বলেন, গাবেরগ্রাম-নাংলা সড়কের নাংলা বাধের মাথা এলাকায় একটি সেতুর প্রয়োজন। সড়কটির আইডি বা পরিচিতি নম্বর নথিভুক্ত না হওয়ায় এটিকে প্রকল্পভুক্ত করা যায়নি। তবে বছর দেড়েক আগে আইডির জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, এটি দ্রুত অনুমোদন হবে। আইডি হলে সেখানে কোন চেইনেজের সেতু প্রয়োজন সেটি উল্লেখ করে প্রস্তাব পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, নাংলা বাধের মাথা এলাকায় সেতু নির্মাণ হলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি উন্নত হবে এই অঞ্চলের কৃষিখাত ও ব্যবসা বাণিজ্য। বদলে যাবে জীবনযাত্রার মান।
খাদেমুল ইসলাম : নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 



















