জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো আবাদ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ৫০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ধান চাষে কৃষকের সময়, শ্রম ও আর্থিক খরচ কমিয়ে ফসল উৎপাদন বাড়ায় দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়া একযোগে কৃষকের বোরো ধান উৎপাদন করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সমলয়ে চাষাবাদ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। এই পদ্ধতিতে বীজতলা থেকে চারা তোলা, চারা রোপণ, ধান কাটা-মাড়াইসহ সব প্রক্রিয়া যন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করা হয়। ফলে কৃষিতে খুলছে এক নতুন দুয়ার।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের কাতলামারী এলাকার ৮২ জন কৃষক ৫০ একর জমিতে যান্ত্রিক উপায়ে সমলয় পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ফসলের আবাদ করছেন। ৫০ একর জমিতে বোরো আবাদের জন্য সাড়ে চার হাজার ট্রে-তে বীজতলা তৈরি করা হয়।
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি জমিতে যন্ত্রের (রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার) মাধ্যমে চারা রোপণ করা হয়। প্রকল্পের অধীন চাষিদের চাষাবাদের যাবতীয় খরচ অর্থাৎ আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ট্রে-তে বীজতলা তৈরি, সার-বীজ-কীটনাশকের সুষম ব্যবহার, ধানের চারা রোপণ, হারভেস্টার মেশিনে ঝাড়াই-মাড়াইসহ সবকিছু দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ গাঢ় সবুজ ধান গাছে ঢাকা পড়েছে। বাতাসে বোরো ধানের সবুজ ঢেউ কৃষকদের মন ভরিয়ে দিচ্ছে। ঢেউয়ের মতো খেলে যাচ্ছে ধান গাছের সবুজপাতা ও কাঁচা শীষ। কয়েক দিনের মধ্যেই শীষে দুধ-দানা পরিপক্ক হতে শুরু করবে। আর এমন সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলে উঠছে প্রকৃতি। এ যেন বোরো ধানে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।

কাতলামারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, এ পদ্ধতিতে ধানের আবাদ আগে কখনও দেখিনি। প্রথমবারের মত কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো আবাদ করছি। আশা করি ভাল ফলন হবে। এ বছর ফলন ভাল হলে কৃষকদের আগ্রহও বাড়বে।
একই এলাকার কৃষক ফজল মিয়া বলেন, এক বিঘা জমিতে বোরো ধানের চারা লাগাতে গেলে চার থেকে পাঁচজন শ্রমিক লাগে। আর মেশিন দিয়ে লাগাতে গেলে আধা ঘন্টাও সময় লাগে না। এবার হাতে লাগানো ধানের চেয়ে মেশিনের লাগানো ধান অনেক ভাল হয়েছে। মেশিনে লাগানো ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করা সহজ। এছাড়াও ধান ক্ষেতে আগাছা কম হয়। পানিও কম লাগে।
মোসলেবাদ এলাকার জোবাইদুল ইসলাম ইব্রাহিম বলেন, দিনদিন কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে যাচ্ছে। ‘সমলয়’ পদ্ধতিতে চাষ করলে যন্ত্রের ব্যবহার সহজতর হবে। কৃষকের সময়, শ্রম ও খরচ কমবে। কৃষক লাভবান হবেন। এতে বাঁচবে কৃষক। বাঁচবে দেশ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, সর্বাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারসহ ধানের উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার, ট্রে-তে বীজ তৈরি, কম বয়সের চারা রোপণ, চারা রোপণে রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার ব্যবহার, সুষম সার ব্যবহার, ধান কাটায় কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো, উৎপাদন খরচ কমানো ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ভরা মৌসুমে ধান কাটার সময় কৃষি শ্রমিকের সংকটের সমাধানে ‘সমলয় চাষাবাদ’ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হবে। এছাড়াও এক ফসলি জমি দুই ফসলি, দুই ফসলি জমি তিন ফসলি জমিতে পরিণত হবে। এতে অর্থনৈতিকভাবে কৃষক লাভবান হবে। দেশের উৎপাদন ঘাটতি কমবে।
তিনি আরও বলেন, সফলভাবে ফসল উৎপাদনের জন্য সমলয়ে চাষাবাদ পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে কাতলামারী এলাকায় ৫০ একর জমিতে প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে।
খাদেমুল ইসলাম : নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 



















