দরিদ্র এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ভিক্ষার বদলে কর্মীর হাতে রূপান্তর করতে জামালপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে লাগসই কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ১৮ মে, সোমবার জামালপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে চারজন বিপদাপন্ন উপকাভোগী ব্যক্তিদের মাঝে আয়বর্ধনকারী উপকরণ সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। যা ভিক্ষার বদলে কর্মের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হবে বলে জানান বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধক সমাজসেবা অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ও সরকারের উপসচিব মো. গোলাম মোস্তফা।

সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার। বিতরণকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রোকোনুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক আবু ইলিয়াস মল্লিক, সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌসী, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন প্রমুখ।
উপকারভোগী ব্যক্তিরা হলেন শেখ ফরিদ, শাহ আলম, মোছা. রোজিনা ও মোরাদ মিয়া। তাদের প্রত্যেকরই ছোট ছোট স্পর্শকাতর গল্প আছে। যেমন-
জামালপুর সদর উপজেলার গোদাশিমলা গ্রামের বাসিন্দা ইমান আলীর ছেলে শেখ ফরিদ একজন প্রতিবন্ধী সহায়-সম্বলহীন ভিক্ষুক। তার নিজস্ব কোন বাড়িঘর বা জমি না থাকায় বর্তমানে তিনি তার নানির ঘরে বসবাস করেন। জন্মগতভাবে তার দুটি পা ছোট এবং বলহীন হওয়ায় তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। তার জন্মের পর তার বাবা তার মাকে রেখে চলে যান এবং অন্যত্র বিয়ে করেন। প্রতিবন্ধী নাতি মো. শেখ ফরিদকে নানী অনেক কষ্টে বড় করেন। প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে শেখ ফরিদকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ইতোমধ্যে তিনি অটোরিকশা চালানো শিখেছেন এবং কেউ যদি তাকে অটোরিকশায় উঠিয়ে দেন তাহলে তিনি মোটামুটি সারাদিন অটোরিকশা চালাতে পারেন। তিনি ভিক্ষা করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু তার অন্য কোন রোজগারের পথ না থাকায় এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি তার কর্মের মাধ্যমে সংসার চালানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছেন। শ্রমের মাধ্যমে রোজগারের কোন ব্যবস্থা হলে তিনি আর ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না মর্মে অঙ্গীকার করেছেন। তার চাহিদা অনুযায়ী তাকে একটি ইজিবাইক বা অটোরিকশার মাধ্যমে পুনর্বাসিত করার উদ্যোগ হিসাবে এদিন বাস্তবায়ন করা হয়।

অপরদিকে দহেরপাড় গ্রামের বাসিন্দা জোয়াদ আলীর ছেলে শাহ আলম একজন প্রকৃত ভিক্ষুক। তার বাবা ছিলেন একজন আশ্রিত ভিক্ষুক। শাহ আলমের স্ত্রী-সন্তান সকলেই প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি অনেক অসহায় এবং বর্তমান সমাজের বোঝাস্বরূপ। তার নিজের নামে কোন সম্পদ না থাকায় স্ত্রী সন্তানসহ অন্যের বাড়িতে বসবাস করেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করে দিন শেষে যেটুকু রোজগার করেন তা দিয়ে প্রতিবন্ধী স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন। তিনি ভিক্ষা করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু তার অন্য কোন রোজগারের পথ না থাকায় এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি তার কর্মের মাধ্যমে সংসার চালানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছেন। শ্রমের মাধ্যমে রোজগারের কোন ব্যবস্থা হলে তিনি আর ভিক্ষা বৃত্তি করবেন না মর্মে অঙ্গীকার করেছেন।তার চাহিদা অনুযায়ী তাকে একটি রিকশাভ্যান গাড়ির মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হবে।
ছোনটিয়া বাজারের বাসিন্দা মজিবর রহমানের কন্যা রোজিনা একজন প্রতিবন্ধী সহায়-সম্বলহীন ভিক্ষুক। তার নিজস্ব কোন বাড়িঘর বা জমি না থাকায় বর্তমানে তিনি সরকারি একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। জন্মগতভাবে তার দুটি পা অবস (বলহীন) হওয়ায় তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। জন্ম থেকেই তিনি প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাবা মা তাকে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও লালন পালন করে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর কাছে বিয়ে দেন। তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোন ধরনের কাজকর্ম করতে পারেন না। সংসার চালানোর তাগিদে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে বাধ্য হন। প্রতিবন্ধী মোছা. রোজিনা বলেন, জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষের কাছে হাত বাড়াতে হয়। আমি ভিক্ষা করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু আমাদের অন্য কোন রোজগারের পথ না থাকায় এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। তিনি তার কর্মের মাধ্যমে সংসার চালানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছেন। শ্রমের মাধ্যমে রোজগারের কোন ব্যবস্থা হলে তিনি আর ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না মর্মে অঙ্গীকার করেছেন। তার চাহিদা অনুযায়ী তাকে একটি মুদির দোকানের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কৈডোলা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেনের ছেলে মো. মোরাদ একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক। তার বাবা একজন অতিদরিদ্র লোক। তার কোন নিজস্ব জমিজমা না থাকায় বর্তমানে তিনি অসহায় প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। জন্মগতভাবে দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে পড়াশোনা করানো সম্ভব হয়নি। জন্ম থেকেই তিনি প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাবা মা তাকে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও লালন পালন করে বড় করেছেন। কিন্তু তিনি শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোন ধরনের কাজকর্ম করতে পারেন না। সংসার চালানোর তাগিদে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে বাধ্য হন। প্রতিবন্ধী মো. মোরাদ বলেন, জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষের কাছে হাত বাড়াতে হয়। আমি ভিক্ষা করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু আমার অন্য কোন রোজগারের পথ না থাকায় এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। তিনি তার কর্মের মাধ্যমে সংসার চালানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছেন। শ্রমের মাধ্যমে রোজগারের কোন ব্যবস্থা হলে তিনি আর ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না মর্মে অঙ্গীকার করেছেন। তার চাহিদা অনুযায়ী তাকে একটি মুদির দোকানের জন্য ২৫ হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী হস্তান্তর করা হয়।
জাহাঙ্গীর সেলিম : সম্পাদক, বাংলারচিঠিডটকম 

















