[সার-সংক্ষেপ : ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘শিখা’ অভ্যুদয়ের ১০০ বছর পূর্তি হবে ২০২৬ সালের ১৯ শে জানুয়ারি। ১৯২৬ সালের ১৯ শে জানুয়ারি ঢাকায় প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় এই প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র বার্ষিক ‘শিখা’। সাহিত্য সমাজ একটি সর্বজনীন সংস্থা ছিল। সাহিত্য সমাজের নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি ছিল অসাম্প্রদায়িক সংগঠন। সমকালের প্রয়োজনে ও বাস্তবতার নিরিখে তারা ‘মুসলিম’ শব্দটি গ্রহণ করেছিলেন। পূর্ববাংলার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান সমাজের শত বছর আগের এই সংগঠন জাতির অগ্রগতির ইতিহাস বিনির্মাণে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। একশো বছর আগের সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা আজও বিদ্যমান। সাহিত্য সমাজের সঙ্গে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। বাংলার তারুণ্যের প্রতীক কাজী নজরুল তার উদ্দাম যৌবনের দিনগুলোতে একাধিকবার বর্ধমান হাউসে এসেছেন। সাহিত্য সমাজের অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তিনি ঢাকায় এলে তার থাকার ব্যবস্থা হয় এই বর্ধমান হাউসে। এ সময়ে কাজী নজরুল এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন যা তার জীবন ও সাহিত্যে গভীর রেখাপাত করে। ‘শিউলিমালা’ (১৯৩১) গল্পগ্রন্থ ও ‘চক্রবাক’ (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থে কবি যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তা বর্ধমান হাউসে অবস্থানকালীনেরই প্রতিচ্ছবি। এদেশের মাটি, মানুষের প্রতি ছিল তার অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই সময় থেকেই তার কবিতা, গান ও বক্তৃতায় এদেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন তিনি। সাহিত্য সমাজের বার্ষিক কার্যক্রমের মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা কাজী নজরুলের গান দিয়ে শুরু হয়েছিল। আজকের এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ শতবর্ষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনেরই ফসল। এ জন্য বারবার উচ্চারিত হয় যে, কাজী নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউস থেকে বাংলা একাডেমি এক বিরাট ইতিহাস। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা, একুশের রক্তস্রোত দ্রোহ, একুশের সাফল্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা। কালের পরিক্রমায় বর্ধমান হাউসকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি, অমর একুশে বইমেলা ও একুশের অনুষ্ঠানমালা, নজরুল মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অনেক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনার সঙ্গে বর্ধমান হাউস, কাজী নজরুল, সাহিত্য সমাজ এবং স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য প্রত্যয়। একটির সঙ্গে আরেকটি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। অর্থাৎ একটি ছাড়া অপরটি খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ। এই প্রবন্ধে ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার প্রয়াস করেছি।]

বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) সময়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সরকারি বা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তখন যেসব ভবন নির্মিত হয় সেসব ভবনের একটি ভবন ‘বর্ধমান হাউস’। ব্রিটিশ শাসন পরিষদের তিন সদস্যের একজন ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা স্যার বিজয় চাঁদ মাহতাব। শাসনকার্যের জন্য ঢাকায় এলে এ বাড়িতে রাজকীয় অতিথি হিসেবে বাস করতেন তিনি। তিনি এ ভবন থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন বলেই ভবনটির নাম বর্ধমান হাউস। এভাবে ১৯৪৭ পর্যন্ত মূলত এটি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের অতিথিশালা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বাসভবন, ছাত্রবাসসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হতো। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বর্ধমান হাউসে বসবাসকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট থেকে পূর্ব বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, কখনো পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে এ ভবন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন হওয়ায় এ ভবনের প্রতি জনারোষ পতিত হয় এবং এ ভবনকে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে রূপান্তরিত করার দাবি প্রবল হয়। ভাষা শহিদদের রক্তের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত, সাধারণ মানুষের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রভৃতি কারণে এই ভবনে ১৯৫৫ সালে ৩রা ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে ২৫ শে মার্চ কালোরাতে ঐতিহাসিক এই ভবনকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামানের শেল নিক্ষেপ করে।
বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জড়িয়ে আছেন গভীর একাত্মতায়। কাজী নজরুল আমন্ত্রিত বরেণ্য অতিথি হিসেবে একাধিকবার এ ভবনে এসেছেন। এ বিষয়ে ভবনটির নিচতলার দেয়ালে ৩রা ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে স্থাপিত এক প্রস্তরখণ্ডে বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুলের আগমনের তথ্য রয়েছে। কবি নজরুল ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ১৯২৬ সালের ২৪শে জুন প্রথম ঢাকায় আগমন করেন। সেই সময় কেন্দ্রীয় আইন সভায় তদানীন্তন সমগ্র ঢাকা বিভাগ থেকে মুসলমানদের জন্য দুটি আসন সংরক্ষিত ছিল, যার একটিতে কবি নজরুল প্রার্থী ছিলেন। জানা যায়, ১৯২৬ সালের শেষ দিকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম নির্বাচনে কংগ্রেস-সমর্থিত অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির প্রার্থী ছিলেন। তার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগের প্রার্থী, বরিশালের বামনার জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল চৌধুরী (তিনি ছিলেন রাজবাড়ীর পদমদীর জমিদার নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর ভ্রাতুষ্পুত্রী ও আসমাতুন্নেছার স্বামী), টাঙ্গাইলের জমিদার আব্দুল হামিদ গজনভী, ঢাকার নবাববাড়ির আব্দুল করিম ও মফিজ উদ্দিন আহমেদ। স্বরাজ পার্টি-কংগ্রেস থেকে নিম্ন আইন পরিষদে নির্বাচন করেন ফরিদপুরের তরুণ জমিদার চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে লাল মিয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগ থেকে তমিজউদ্দিন খান। তারুণ্যদীপ্ত কাজী নজরুলের খ্যাতি তখন সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। নির্বাচনি প্রচার কাজ চালাতে গিয়ে কবিকে বাববার প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তখন তিনি তার লেখা ইসলামি গান ও কবিতা শুনিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। এ সময় প্রগতিপন্থি তরুণদের এগিয়ে আসার জন্য বারবার আহ্বান করেছেন তিনি। নির্বাচনি কাজে কবি নজরুলের ঢাকায় আগমনের খবর পেয়ে কবি আবদুল কাদির ও তাঁর সাহিত্যিক বন্ধু মোহাম্মদ কাসেম এবং আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্নসহ অনেকে কবির সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় সাহিত্য সমাজের নেতা কর্মীদের সাথে তার পরিচয় হয়। কবি নজরুল সাহিত্য সমাজের খবর আগেই শুনেছিলেন এবং দূর থেকে শুরু থেকেই এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সরাসরি তাদের নিকট ঢাকা সাহিত্য সমাজের হিন্দু মুসলিম সমন্বয় ধারার যুক্তিবাদী-প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের খবর শুনে খুবই প্রীত হন এবং তাদের সঙ্গে যুক্তভাবে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৯২৬ সালের ২৭-২৮ শে জুন মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সমাজের বিশেষ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সাহিত্য সমাজের কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সময় সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের বর্ধমান হাউস ছাত্রাবাসের [বর্ধমান হাউস তখন মুসলিম হলের অন্তর্ভুক্ত] হাউস টিউটর তরুণ শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীকালে কাজী নজরুল বর্ধমান হাউসে বেশ কয়েকবার তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হল কিছুকাল তদানীন্তন প্রাদেশিক সচিবালয় হাউসে (পরে তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বহিঃবিভাগ) প্রথম তলায় কার্যক্রম শুরু করে। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম হল। কিছুকাল পরে বর্তমান জায়গায় সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

কবি নজরুল যতবারই ঢাকায় এসেছেন প্রতিবারই বর্ধমান হাউস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের বাসাসহ অনেক জায়গায় গিয়েছেন। তরুণ লেখক, ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে উষ্ণ সময় কাটিয়েছেন তিনি। ১৯২৭ সালের ২৭-২৮শে ফেব্রুয়ারি সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের নিমন্ত্রণ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে সাহিত্য-সমাজের সম্পাদক আবুল হুসেনকে কৃষ্ণনগর থেকে ১০-২-১৯২৭ তারিখে লিখেন, ‘প্রিয় আবুল হুসেন সাহেব। আপনার আমন্ত্রণলিপি নব-ফাল্গুনের দখিন হাওয়ার মতই খুশখবরী নিয়ে এসেছে’। [শাহাবুদ্দীন আহমদ (১৯৯৫), নজরুলের পত্রাবলী, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, পৃ. ৪৭]। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম হল মিলনায়তনে। কাজী নজরুল ঢাকায় সাহিত্য সমাজের সম্মেলন অংশগ্রহণ করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের তরুণ শিক্ষক আবুল হুসেনের বাসায় উঠেছিলেন। তখন তার বাসা ছিল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ সংলগ্ন জায়গায়। সম্মেলন উপলক্ষ্যে কাজী নজরুল তাঁর সদ্য রচিত ‘খোশ্ আমদেদ’ গানটি গেয়ে বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধন করেন। [কাজী মোতাহার হোসেন (২০০৭), স্মৃতিকথা, ঢাকা, পৃ. ৬৬] সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন কবি নজরুল দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আজ আমি এই মজলিসের আমার আনন্দ বার্ত্তা ঘোষণা করছি। বহুকাল পরে কাল রাত্রে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নূতন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্ত্তা চতুর্দ্দিকে ঘোষণা করে বেড়াব।’ [মুস্তাফা নূরউল ইসলাম (সম্পা.) (২০০৩), শিখাসমগ্র, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ. ১৭৯]
এই সম্মেলনে উদ্বোধনী সংগীত ও কবিতা আবৃত্তি এবং সাহিত্য সমাজের তরুণ সদস্যদের উদ্দেশে উৎসাহমূলক বক্তব্য প্রদান করেন তিনি। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুলের বক্তৃতাটি তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ ছিল। দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে আগত বিশিষ্টজনেরা প্রবন্ধ-নিবন্ধ পাঠ করেন এবং শিল্পীরা সংগীত পরিবেশনা করেন। প্রবন্ধকারদের মধ্যে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, মোহাম্মদ কাসেম, কাজী আনোয়ারুল কাদির, শামসুল হুদা, আবুল হুসেন প্রমুখ। সম্মেলনে এসে আবদুল কাদির, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্নসহ অন্যান্যদের সঙ্গে তার নিবিড়ভাবে পরিচয় হয়। সম্মেলনে ইসলামি পুনর্জাগরণ বিষয়ে বক্তব্য দেন, ‘খালেদ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন, গজল পরিবেশন করেন তিনি। এই সময়ে দিদারুল আলমের অনুরোধে কাজী নজরুল কয়েক পঙ্ক্তির প্রশস্তি লিখে দেন যা যুগের আলোর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ঢাকার সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের বিবরণী সমাজের মুখপত্র বার্ষিক ‘শিখা’য় ছাপা হয়েছিল। প্রথম বর্ষের অনুবৃত্তিক্রমে পরের বছর ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে (১৩৩৪ বঙ্গাব্দের মাঘ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল মিলনায়তনে সাহিত্য সমাজের সম্মেলনের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনও উদ্বোধন করতে ঢাকায় আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম লিখেছেন : ‘১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন হয়, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তখন সাহিত্য সমাজের সম্পাদক। … ঢাকায় এবারের সফরে নজরুল ‘এ বাসি বাসরে আসিলে গো ছলিতে’, ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া পরাণ প্রিয়া’, ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী’ প্রভৃতি গজল গান রচনা করেন যার প্রথম দুটি ‘প্রগতি’তে ছাপা হয়েছিল। ঢাকায় এবারের সফরে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল অনেক বিদগ্ধজনের সঙ্গে যাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়, তাঁর গুণবতী কন্যা উমা মৈত্রেয় (নোটন), অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, কৃতি ছাত্র ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু এবং রানু সোম (প্রতিভা বসু), অংক বিভাগের এম. এ. ক্লাসের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসা প্রমুখ।’ [রফিকুল ইসলাম (২০১৯), নজরুলের বাংলাদেশ-আগমনের শতবর্ষ, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, পৃ. ৮৫]
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের তরুণ শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন ও সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’র সম্পাদক ছিলেন। কবি নজরুল নতুনের গান (চল্ চল্ চল্) গানটি গেয়ে এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন। এবারের যাত্রায় কবি নজরুল প্রথমে উঠেছিলেন আবুল হুসেনের বাসায়। পরে অধিবেশন শেষে কবি নজরুলকে কাজী মোতাহার হোসেনের আতিথেতায় বর্ধমান হাউসের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ সফরে আবদুল কাদিরকে কাজী নজরুলের খোঁজখবর ও দেখাশোনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আবদুল কাদির ছিলেন তখন ঢাকা কলেজের আইএ ক্লাসের ছাত্র। কবি নজরুল আবদুল কাদিরকে খুব স্নেহ করতেন। পরবর্তীকালে কবি নজরুল তাঁর বিবাহের ঘটকালি করেছিলেন এবং মুজফফর আহমদের কন্যা আফিফা খাতুনের সঙ্গে আবদুল কাদিরের বিবাহ (১৯৩৫) সম্পন্ন করে দেন। দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় এসে কাজী নজরুল প্রায় আড়াই সপ্তাহ ছিলেন।
সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে ঢাকায় কাজী নজরুলের সঙ্গে অনেক বিদ্বৎজনের ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক হয়। রানু সোম (প্রতিভা বসু), ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়র কন্যা উমা মৈত্রেয় (নোটন), ফজিলাতুন্নেসা এবং তাঁর ছোট বোন শফিকুন্নেসা প্রমুখের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। রানু সোম (প্রতিভা বসু) ও উমা মৈত্রেয় (নোটন)’র সঙ্গে নজরুলের সংগীতের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। কাজী নজরুল তাঁদের গান শেখাতেন। একদিন রানু সোমকে গান শিখিয়ে নজরুল পুরোনো ঢাকার বনগ্রাম থেকে রাতের অন্ধকারে বর্ধমান হাউসে ফেরার পথে কতিপয় গুন্ডা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে এসে কবি নজরুলের সাহিত্যকর্মে ব্যাপক ছাপ পড়েছিল। বিশেষ করে তাঁর ‘শিউলিমালা’ গল্পগ্রন্থে ও ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থে। ‘বুদ্ধদেব বসু নজরুলের এ সফরের মনোরমভাবে বর্ণনা করেছেন ‘কালের পুতুল’ (১৯৫৮) গ্রন্থে। সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আরও যাঁদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত প্রমুখ অন্যতম। সাহিত্য সমাজের সম্মেলনে কবিতা আবৃত্তি ও জাগরণী গান গেয়ে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। তিনি উদীয়মান অনেক কবি ও লেখককে কবিতা ও গান লিখে দিয়ে প্রেরণা দিয়েছেন। তরুণ সাহিত্যসেবীদের তিনি প্রাণভরে ভালোবাসতেন ও উৎসাহ দিতেন। তাদেরকে নিজ হস্তে অনুভূতি লিখে দিয়ে বই উপহার দিয়েছিলেন। শিক্ষিত তরুণেরা সাহিত্য সমাজের সান্নিধ্যে এসে নতুন করে জগতকে দেখতে শুরু করে। পরবর্তীকালে, বাংলাদেশের অনেক চিন্তাশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবী ‘সাহিত্য সমাজে’র আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সাহিত্য সমাজের নিমন্ত্রণে এসে কত তরুণ সাহিত্যসেবীদের যে কতভাবে উৎসাহিত করেছিলেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
পরবর্তীকালে দু-তিন বছরে কমাস পরপর বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুল কয়েকবার কাজী মোতাহার হোসেনের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। প্রতিবারে মাসাধিককাল অবস্থানের ঐতিহাসিক ঘটনা শুধু কবি নজরুলের জীবনেই নয়, তাঁর সাহিত্যকর্মে বিশেষ করে তাঁর কবিতা, গান, গল্গ ও চিঠিপত্রে যেমন ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে তেমনি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য ও সমকালীন সমাজ-চেতনায়। কবি নজরুল বর্ধমান হাউসের ঠিকানায় কাজী মোতাহার হোসেনকে ‘প্রিয় মোতিহার’ সম্বোধনে বেশ কয়েকটি পত্র ও তাকে উদ্দেশ্য করে ‘দাড়ি বিলাপ’ নামে মজাদার কবিতা লিখেছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি সেই সময় দাড়িয়াল পরিচয়ে খ্যাত ছিলেন। সেই সময় কি এক মজার কারণে এগারো বছর পর তার দাড়ি কাটতে হয়। কাজী নজরুল তার এই ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে উক্ত কবিতাটি লিখেছিলেন। সাহিত্য সমাজের আমন্ত্রণে বর্ধমান হাউসে এসে তিনি তৎকালীন স্থবির মুসলমান সমাজে প্রজ্বলিত মশাল হাতে নিয়ে পথের সন্ধান দিয়েছিলেন যা আজ অবধি প্রজ্বলিত শিখা হয়ে সারা দেশময় জ্বলছে। সাহিত্য সমাজের সদস্যরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও যুক্তিবাদী। তারা নিজেদের সময়ের চাইতে এগিয়ে চিন্তা ও বিচার করতেন। সবদিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া তৎকালীন মুসলমান সমাজের কাছে উদার চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির জন্য সাহিত্য সমাজের যেমন আবশ্যকতা ছিল তেমনি আজকের প্রেক্ষাপটেও বেশ প্রাসঙ্গিক। এই প্রাসঙ্গিকতা কোনো সময়ের আবর্তে কিংবা ভূগোলের বিভাজনে বিভক্ত নয়। ‘শিখা’ পত্রিকার টাইটেল পৃষ্ঠায় ‘মুখবাণী’ (Motto) হিসেবে লেখা থাকত : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এটিই ছিল তাঁদের জীবনদর্শন। এই জীবনদর্শনের সঙ্গে কাজী নজরুলের আদর্শের মিল ছিল। সাহিত্য সমাজের সদস্যরা সাহিত্য শব্দটিকে বিস্তৃত অর্থে শিল্পচর্চা, নারী শিক্ষা, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে উৎসাহিত করতেন। পরবর্তীকালে শিখাসংশ্লিষ্ট আবুল হুসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির, আবুল ফজল, মোহাম্মদ কাসেম, আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্নসহ প্রায় সকলেই সাহিত্য সমাজের সাথে কাজী নজরুলের যুক্ততা সম্পর্কে লিখেছেন। সাহিত্য সমাজ এগারো বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও বুদ্ধির মুক্তির চিন্তার আন্দোলন এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল এবং এ সংগঠনের অন্তর্যাত্রীরা আজীবন সেই ধারণাটাই পোষণ করেছেন। সংগত কারণে বাংলাদেশের ইতিহাস বাস্তবতার পটভূমিতে বর্ধমান হাউস ও কবি কাজী নজরুল এ দুটি অবিচ্ছেদ্য প্রত্যয়। এই প্রত্যয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ ও স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।
বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুলের আগমন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যময় ঘটনা। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসেও তার ভূমিকা অবিভাজ্য ও অনিবার্য। তার লেখায় বাংলা ভাষাভাষীদের জাতিসত্তার বিভিন্ন উপাদান ব্যাপকভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে যা অন্য কোনো লেখকের লেখায় তেমন ঘটেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে গেলে কাজী নজরুলের কথা বলতে হয়। যে স্বাধীনতা ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য শহিদ ও মা-বোনের নির্যাতনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে কাজী নজরুলের কবিতা ও গান যুদ্ধাস্ত্রের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলোতে কাজী নজরুলের কবিতা ও গান জাতিকে বিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে। তার লেখা ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘নম নম বাংলাদেশ মম’, ‘চল্ চল্ চল্’ প্রভৃতি গান ও ‘পূর্ববঙ্গ’সহ অনেক কবিতা মুক্তি সংগ্রামে এদেশের মানুষকে নবজাগরণের প্রেরণা জুগিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের সাথে কাজী নজরুলের নাম ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
উত্তরকালে আমরা আরও দেখতে পাই যে, বর্ধমান হাউসকে কেন্দ্র করেই মহান একুশের রক্তস্নাত দ্রোহ এবং এরই পরবর্তীকালে বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ফলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি—এই প্রত্যয়গুলো যেন অভিন্নসূত্রে গ্রথিত। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ একাডেমির বর্ধমান হাউসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ এবং একাডেমির চত্বরে ‘নজরুল মঞ্চ’ ও অন্যান্য স্মারক রয়েছে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস কাজী নজরুলের স্মৃতির ধারক ও বাহক। বর্ধমান হাউসে ও এর প্রাঙ্গণে কবি নজরুলের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েকটি স্থাপনা। কাজী নজরুলের স্মৃতির নিদর্শনস্বরূপ বর্ধমান হাউসে ১৯৭৮ সালের ২৯শে আগস্ট ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ উদ্বোধন এবং ২০০৩ সালের ২৫শে জুন বর্ধমান হাউসের সম্মুখস্থ বটতলায় ‘নজরুল চত্বর’ ও ‘নজরুল মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নজরুল মঞ্চের ওপর নজরুল ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন ভাস্কর হামিদুজ্জামান। ২০২১ সালে কাজী নজরুলের রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে এই মঞ্চে কবিতাটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দৃষ্টিনন্দনভাবে ভাস্কর জাহানারা পারভীনের কারুকার্যে মার্বেল পাথরে শিলালিপিতে খোদিত আকারে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। তাছাড়া ১৯৭৬ সাল থেকে বর্তমান অবধি একাডেমির সম্মুখস্থ সড়কের নাম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ এবং বাংলা একাডেমির প্রধান ও একমাত্র কার্যালয় এই সড়কেই অবস্থিত। বাংলা একাডেমি কাজী নজরুলের জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে। বাংলা একাডেমি ১৯৬১ সালের ২৫শে মে সপ্তাহব্যাপী নজরুল-জয়ন্তী উৎসব আয়োজন করেছিল। এই আয়োজনে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রকাশিত সমস্ত গ্রন্থ, সম্পাদিত পত্রিকা, এগুলোর প্রথম সংস্করণ, নিজের লেখা পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, কবির বিভিন্ন বয়সের আলোকচিত্র, কবি ও তাঁর গ্রন্থ সম্পর্কে লিখিত পুস্তক ও প্রবন্ধাদি প্রদর্শন করা হয়েছিল। সেই থেকে শুরু করে একাডেমিতে প্রতি বছর কাজী নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে কোনো বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিত ব্যক্তির দ্বারা কাজী নজরুলবিষয়ক প্রবন্ধ রচনা ও পাঠ করা হয়। এছাড়া কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি ‘নজরুল পুরস্কার’ প্রদান করে আসছে।
কাজী নজরুলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা অর্পণেরই ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমি কাজী নজরুলবিষয়ক ও তাঁর মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশের অন্যতম পথিকৃতের দাবিদার। বর্তমানে একাডেমি থেকে বারোটি খণ্ডের ‘নজরুল-রচনাবলী’ নজরুল জন্মশতবর্ষ সংস্করণ ছাড়াও নজরুল-সংগীত সংকলনগ্রন্থ, নজরুল-বিষয়ক অনেক গবেষণাগ্রন্থ, নজরুল সাহিত্য-সমালোচনামূলক গ্রন্থ, নজরুল-কাব্যের অনুবাদগ্রন্থ এমনকি নজরুল-সংগীত স্বরলিপিগ্রন্থ প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। উল্লিখিত কাজগুলোর মধ্যে ‘নজরুল রচনাবলী’র কাজ বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত কক্ষে সম্পন্ন করা হয়। মূলত বাংলা একাডেমি থেকেই প্রতিষ্ঠানিকভাবে নজরুল-চর্চার ব্যাপকতররূপে শুরু হয়। এক্ষেত্রে কবি আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড (সেন্ট্রাল বোর্ড ফর ডেভেলপমেন্ট অব বেঙ্গলি)-এর উদ্যোগে এবং প্রখ্যাত নজরুল গবেষক আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় ‘নজরুল-রচনাবলী’ প্রকাশনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যুগোপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ ছিল। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে ‘নজরুল-রচনাবলী’র ৩টি খণ্ড (১ম খণ্ড, ১৯৬৬; ২য় খণ্ড, ১৯৬৭, ৩য় খণ্ড, ১৯৭০) প্রকাশিত হয়।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমির সঙ্গে ‘কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ একীভূত হয়। আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে ৩টি খণ্ড এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমি থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই নজরুল-রচনাবলী ৪র্থ খণ্ড (১৯৭৭), ৫ম খণ্ড, প্রথমার্ধ (জুন ১৯৮৪); ৫ম খণ্ড, দ্বিতীয়ার্ধ (ডিসেম্বর ১৯৮৪) মোট এই ৫টি খণ্ড তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এই ৫টি খণ্ড প্রকাশিত না হলে নজরুল-চর্চা ও গবেষণার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতো। মোটকথা, এ পাঁচ খণ্ড প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে সমগ্র কাজী নজরুল-রচনা সংকলন সম্পূর্ণ হয়। অতঃপর দীর্ঘ বছর কাজী নজরুলের রচনাবলি মুদ্রিত না হওয়ায় বাংলা একাডেমি পূর্ণাঙ্গভাবে ‘নজরুল-রচনাবলী’ পুনঃপ্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমি ২০০৫ সালের অক্টোবরে নজরুল-জন্মশতবর্ষ সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উপলক্ষ্যে নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে তার তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় ছয় সদস্যের সম্পাদনা-পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। এই সম্পাদনা-পরিষদ বাংলা একাডেমির কাজী নজরুলের স্মৃতিধন্য কক্ষে কাজটি সম্পন্ন করেছে। ‘নজরুল-রচনাবলী’ নজরুল-জন্মশতবর্ষ সংস্করণ ২০০৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে বারোটি খণ্ড প্রকাশ করেছে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘নজরুল-রচনাবলী’ এই ১২টি খণ্ড নজরুল জন্মশতবর্ষ সংস্করণ এখন অবধি পাওয়া যাচ্ছে এবং বারবার পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতি কবি নজরুলের গভীর ভালোবাসা ছিল। এ কথা বারবার উচ্চারিত হয় যে বাংলাদেশ ও কবি নজরুল এ প্রত্যয় দুটি পরস্পরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য। পক্ষান্তরে, কবি নজরুলের সৃষ্টিকর্মে বাংলাদেশের মাটি, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ প্রভৃতি অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। তিনি বাংলাদেশের নানা স্থানে ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে, কখনো সংবর্ধনা উপলক্ষ্যে, কখনো সম্মেলন, কখনো অতিথি, কখনো গায়ক, কখনো বক্তা, কবি, আবৃত্তিকার হিসেবে, আবার কখনো রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে গিয়েছেন। বিশ শতকের ত্রিশ দশকে বারবার কবি নজরুলের ঢাকায় আগমন এবং সময় সময়ে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে অবস্থান একটি তাৎপর্যময় ঘটনা। কবি নজরুলের ঢাকায় অবস্থানের সময় এদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ খুবই প্রতিকূল ছিল। সেই সময় সারা বাংলার বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তাল। অসহযোগ-সন্ত্রাসবাদ আন্দোলন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর বেঙ্গল প্যাক্টের ব্যর্থতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি বিষয় কবি নজরুলকে ভাবিয়ে তুলেছিল। কবি নজরুল স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন বাংলাদেশের। পরবর্তীকালে তাঁর এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
কবি নজরুল কালের প্রয়োজনেই বর্ধমান হাউসে এসেছেন। তিনি বর্ধমান হাউসের চত্বরে ও পুকুর পাড়ে বসে গান গাইতেন, বাঁশি বাজাতেন। বর্ধমান হাউসে তিনি রেখে গেছেন অনেক স্মৃতি ও সৃষ্টির স্বাক্ষর। এসব তথ্যাদি কবি নজরুলের রচিত বিভিন্ন রচনা, চিঠিপত্র এবং সমসাময়িককালে তার বন্ধু, প্রিয়জন ও ভক্তদের স্মৃতিকথায় রয়েছে। কালের পরিক্রমায় বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং কাজী নজরুল ইসলামের এখানে অবস্থান করার ফলে দেশ-কাল বাস্তবতার পটভূমিতে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা এখনো বিরাজমান। কবি নজরুল প্রথম ১৯১৪ সালে সপ্তম শ্রেণির ছাত্ররূপে আগমনের পর ১৯৪০ সাল অবধি অনেকবার এদেশে এসে তার অনলবর্ষী ভাষণ, জাগরণমূলক কবিতা ও গানের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জাগরণের সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি পশ্চাৎপদ পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও এনেছিলেন এক ভিন্নতর জাগরণ, প্রেরণা, সম্প্রীতি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। সেই সময় থেকেই কাজী নজরুল বাংলাদেশের খুব জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।
পূর্ব বাংলার গৌরবের প্রতীক ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুলের আগমন এবং সাহিত্য সমাজের প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য জাতিগতভাবে আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সম্পর্কে উদাসীন। এজন্য কাজী নজরুলসহ অনেক গুণিজনের সারা বাংলাদেশে স্মৃতিবিজড়িত স্থান সম্পর্কে জানি না এবং সংরক্ষণ করার চেষ্টা করি না। ঐতিহ্যের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন মুসলিম হলসহ ঢাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নানা স্মৃতিবিজড়িত স্থানে তথ্য লিপিবদ্ধ করে শ্বেতপাথরের প্রস্তরখণ্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। কাজী নজরুলের নামানুসারে ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও ছাত্র-শিক্ষকেরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলেই এ কাজটি সম্পাদন করা যায়। এটা করা হলে জাতীয় কবি ও সাহিত্য সমাজ সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম নানা তথ্য জানতে পারবে। কবি নজরুলের কর্মময় জীবনে নানা ঘটনা-উপঘটনা রয়েছে। তারুণ্যদীপ্ত কাজী নজরুলের স্মৃতির অন্যতম স্থান হলো ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান হাউস ও মুসলিম হল। কাজী নজরুল এখানে রেখে গেছেন অনেক স্মৃতি ও সৃষ্টির স্বাক্ষর। সেসব তথ্যাদি কবি নজরুলের রচনা, চিঠিপত্র এবং ভক্তদের স্মৃতিকথাসহ নানা মাধ্যমে লিপিবদ্ধ রয়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কবি নজরুলের জীবন, সৃষ্টিকর্ম ও মৃত্যুর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। কাজী নজরুলের সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশ সৃষ্টিতে অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে। সংগত কারণেই কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্মের ইতিহাস জানতে গেলে, বুঝতে গেলে মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসে তার স্মৃতির প্রাসঙ্গিকতা কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না।
গ্রন্থপঞ্জি :
১. নজরুলের পত্রাবলী, শাহাবুদ্দীন আহমদ, প্রথম মুদ্রণ ২০০৬, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা
২. শিখাসমগ্র, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম (সম্পা.), প্রথম মুদ্রণ ২০০৬, বাংলা একাডেমি, ঢাকা
৩. নজরুলের বাংলাদেশে-আগমনের শতবর্ষ, রফিকুল ইসলাম, প্রথম মুদ্রণ ২০১৯, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা
৪. কাজী মোতাহার হোসেন, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৭, স্মৃতিকথা, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক। উৎপাদন অফিসার, বাংলা একাডেমি
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, উৎপাদন অফিসার, বাংলা একাডেমি 

















