চলমান গ্রহণের কালে হতাশার সুরে যখন গোটা পৃথিবী জুড়ে করুণ ব্যঞ্জনা অনুরণিত শুরু হয়েছে, কতিপয় ধর্মান্ধজনের নির্মম ও নির্লজ্জ আঘাতে যখন আমাদের সুস্থধারার সংস্কৃতি অঙ্গনগুলো ক্ষত-বিক্ষত, কালোহাতের নখরাঘাতে যখন আমাদের বাকস্বাধীনতা, আমাদের লেখনি শক্তির টুটি চেপে ধরে রক্তাক্ত করছে, যখন হায়েনার মত নিরপরাধ শিকার ধরে দাঁত কেলিয়ে বিকৃত হাসে নরপশুরা, যখন সামাজিক অপরাধ ও অপরাধীদের দৌরাত্মে অস্থির সময় পাড় করছে আমজনতা ঠিক তখনই মেঘের আড়াল থেকে এক চিলতে সূর্যের হাসি আশার সঞ্চার করেছে। আজ পৌষের সকালে জামালপুরে শতাধিক শুদ্ধ সংস্কৃতজনের শরীর ও হৃদয় উৎফুল্ল হয়ে উঠে অদ্ভুত এক আনন্দধারায়। নিকষ আঁধারে যেমন দূরের এক বিন্দু আলোয় আশান্বিত হয় পথ হারিয়ে ফেলা ক্লান্ত পথিক।
অনেকদিন পর জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী পরিবার প্রখ্যাত আইনজীবী, বিশিষ্ট সংস্কৃত ব্যক্তিত্ব, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক সৈয়দ আব্দুস সোবহান মহোদয়ের বাড়ির আঙিনাজুড়ে মানুষ থেকে মানব হয়ে উঠার চর্চাধারী এক ঝাঁক প্রাণের মিলনমেলা বসে। জীবনের জয়গানে মুখরিত হয়ে উঠে নিকানো উঠোনটুকু। অনিন্দ্য সুন্দর এক আবহের সৃষ্টি করে সংগীত, আবৃত্তি আর চেতনাঋদ্ধ আলোচনায়।

২৬ পৌষ, ১৬ ডিসেম্বর, শুক্রবার মরহুম সৈয়দ আব্দুস সোবহান উকিলের বাড়ির আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয় তাঁর সুযোগ্য কন্যা বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, প্রখ্যাত চিকিৎসক শাহীনা সোবহান মিতুর সুপাঠ্য পাঁচটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন। এ উপলক্ষে ভিন্নধারার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
নাট্যজন সাগর মুখার্জির কণ্ঠে পঠিত লেখক শাহিনা সোবহান মিতুর জীবনী পাঠ শোনে অনেকেই নতুন করে সৃষ্টিশীল এক মানবকে চিনতে পারে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, পত্রসাহিত্যের ক্ষুরধার লেখা অনুপ্রাণিত করে সকল পর্যায়ের পাঠকদের। স্মৃতিজাগানিয়া লেখাগুলো পড়ে পাঠক জানতে পারে আমলাপাড়া, আশেক মাহমুদ কলেজসহ জামালপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্য এবং জামালপুরের কীর্তিমান মানুষ সম্পর্কে। তাঁর অনবদ্য কবিতায় মাটি, মানুষ, জীববৈচিত্র, প্রেম ও দ্রোহের ছন্দ খুঁজে কবিতাপ্রেমী পাঠক সমাজ।
শাহিনা সোবহান মিতুর পাঁচটি গ্রন্থেই নাড়িপোতা মাটির গন্ধ পাওয়া যায়। অন্যসময় প্রতিটি গ্রন্থ সমালোচনা লেখার চেষ্টা করবো।
আমার কাছ থেকে দেখা শাহিনা সোবহান মিতুর অসংখ্য গুণকে ছাপিয়ে অনেক উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে তাঁর মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি অন্তরগত উৎস থেকে উৎসারিত ভালবাসা। তাঁর পরম মমত্ববোধে আমি বার বার প্রাণিত হয়েছি। ‘অন্ধজনে দেহ আলো’র মত বিপদাপন্ন মানুষের কাছে তিনি সাক্ষাৎ দেবদূতের মত। অসুস্থ রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর পেলব স্পর্শ যন্ত্রণাকাতর রোগীর মাঝে নবপ্রাণের সঞ্চার ঘটায়। কর্মহীন মানুষের হাতে তুলে দেন তিনি কর্মের হাতিয়ার। তাঁর কারণে একাধিক দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছে। অনেকেরই মাধ্যম ছিলাম আমি নিজে।
জামালপুরে সোনার বাংলা ডায়ালসিস সেন্টারটি তাঁরই প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রক্তের বন্ধনকে নিয়মিত পৃষ্টপোষকতা করে আসছেন মিতু সোবহান। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে বার্ণরোগীদের জন্য ছোট্ট তহবিল গঠন করা হয়েছে তাঁরই কারণে। যেটা আমি স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনা করে আসছি। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা প্রবাসী ডোরা আপার আনুকূল্য অবিস্মরণীয়। ডোরা আপাকে নিয়ে আমি অন্যসময় লেখব।
শাহিনা সোবহান মিতু পরিশুদ্ধ জীবন প্রবাহের স্রোতধারায় অনেকের মত আমিও ঋদ্ধ হয়েছি। সে আমাদের কাছে আলোকবর্তিকার মত প্রবল আঁধারের পথেও আশাভরা পথচলার শক্তিযোগায়। নতুন জীবনের সন্ধানে অন্ধের যষ্টির মত পথ দেখায়।
ভাষা ও মুক্তিসংগ্রামী বাবা, মা, চাচাদের কাছে শিক্ষা ও দিক্ষা নিয়ে শাহিনা সোবহান মিতু সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাস’ নিজে যেমন করছেন অন্যকেও আন্দোলিত করছেন নিয়মিত।
বালিকার জ্বলন্ত সময়, অর্ধেক আকাশ, দিন যাপনের খসড়া নামের তিনটা উপন্যাস এবং যে তুমি হেটে যাও, বসন্তের রৌদ্র ছায়া নামের দুটি কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে জামালপুরের বিদগ্ধ ও শুদ্ধ মানুষগুলো উপস্থিতি শাহিনা সোবহান মিতুকে চেতনাবলয়ে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁর ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে আলোচকদের স্মৃতিজাগানিয়া আলোচনা শোনে সে প্রাণভরে কেঁদেছে। চোখের এ জলের ভাষায় ছিল আনন্দ, আবেগ আর কৃতজ্ঞতার অমলিন প্রকাশ।
কবি প্রফেসর ডাক্তার শাহীনা সোবহান মিতু অর্ন্তবর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সদস্য হিসেবে কাজ করার সময় দেখেছি সত্য বলার দুঃসাহস। তিনি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।মোড়ক উন্মোচন হওয়া বইগুলোতে স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী ও পূর্ববর্তী ইতিহাস, ঐতিহ্য, ৮০’র দশকে কবির স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণ, জামালপুরের সংস্কৃতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমাম দুলাল, কবি সাযযাদ আনসারী, কবি আলী জহির, মাহবুব বারী, অধ্যাপক ফজলুল হক মন্টু, অধ্যাপক আব্দুল হাই আল হাদী, অবসরপ্রাপ্ত লে.কর্নেল মো. জায়েদ হোসেন, মহব্বত আলী ফকির, অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক ইউসুফ আলী, ফজলে এলাহী মাকাম, রাজন্য রুহানী, ময়না আকন্দ, হৃদয় লোহানী, তারিকুল ফেরদৌস, ফারজানা, বাচিক শিল্পী মিন্টু ভাইসহ নাম মনে করতে না পারা অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
শাহীনা সোবাহান মিতুর সাথে তাঁর সহোদর বোন ডাক্তার শামীমা সোবহান সেতু, রুমা সোবহান, জিনাত সোবহান, সোমা সোবহান ও একমাত্র ছোট ভাই জাহিদ সোবহান জয় এবং তার বোনের স্বামীসহ স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সরব উপস্থিতি গোটা পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তুলে।
জাহাঙ্গীর সেলিম : সম্পাদক, বাংলারচিঠিডটকম 



















