নার্সের গাফিলতির কারণে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আফসানা আক্তার (১৪) নামের এক শিক্ষার্থীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়েছে। এতে ওই রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। ঘটনাটি ২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার ঘটে। এ ঘটনায় রোগীর স্বজনদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
২৯ এপ্রিল, বুধবার সকালে এ ঘটনায় জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রোগীর স্বজন। পরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোশায়েরুল ইসলাম সুমনকে প্রধান কারে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করছেন স্বাস্থ্য বিভাগ। বর্তমানে ওই রোগী জেনারেল হাসপাতালে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভিন্ন গ্রুপের রক্ত প্রয়োগ করা আফসানা আক্তার শেরপুর সদর উপজেলার মোকসেদপুর এলাকার আনিসুর রহমানের মেয়ে। তার নানার বাড়ি জামালপুর পৌর শহরের কম্পপুর এলাকায়। সে নারায়ণগঞ্জের রূপসী এলাকার নিউ মডেল নামের একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা পেশায় একজন কৃষক।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) শামীম ইফতেখার বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করতে কমিটি করা হয়েছে। কারও কোন গাফিলতি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী রোগীর মামা আবীর হাসান বলেন, কয়েকদিন আগে আমার ভাগ্নির পেটে ব্যথা অনুভব করে। কোনভাবেই ব্যথা কমছিল না। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে জামালপুরে নিয়ে আসা হয়। ২৫ এপ্রিল, শনিবার স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে দেখানো হলে তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেন, কিডনিতে ময়লা জমতে পারে। আপনারা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে ওই দিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক বেশকিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা দেন। সেই সব পরীক্ষাগুলো বাইরে থেকে করানো হয়। সকল পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার এপেন্টিসাইড হয়েছে বলে জানান। অপারেশন করার কথা বলেন।
পরে ২৮ এপ্রিল অপারেশন করানো হয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর রক্ত লাগবে সেই ধরনের কোন কথা বলেননি। কিন্তু অপারেশনের পর নার্স তাকে রক্ত পুশ করতে আসেন। তখন আমার বোন তাকে বাধা দেয়। এ সময় নার্স আমার বোনের সাথে খারাপ আচারণ করেন। জোরপূর্বক শরীরে রক্ত দেন। প্রায় আধা ঘণ্টা রক্ত শরীরে যাওয়ার পর দেখা যায় রক্তটি ভিন্ন গ্রুপের। শরীরে যে রক্ত পুশ করা হয়েছে সেটা “ও” পজেটিভ। আর আমার ভাগ্নির রক্তের গ্রুপ “এ” নেগেটিভ। তা ছিল পাশের বিছানার সিজারের রোগীর রক্ত। পরে তার শরীর রক্ত দেওয়া বন্ধ করা হয়। কিন্তু এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া ছিল না। আমি এ খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে ভিডিও দিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করি। তখনও কর্তব্যরত চিকিৎসক বা নার্সেরা কেউই বিষয়টা নিয়ে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।
এ সময় আমার পরিচিত একজনের কাছ থেকে হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রোগীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়ার বিষয়টি তাকে জানানো হয়। পরে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসককে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললে তারা আলাদা চিকিৎসার পাশাপাশি নজরদারি শুরু করেন। এখন আমার ভাগ্নির শরীরে জ্বর আছে। বমি বমি একটা ভাব রয়েছে। আমি যতটুকু জানি একজন মানুষের শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়া হলে তার মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। ভবিষ্যতেও এটার প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। এ ঘটনায় আমি জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। ভবিষ্যতের কথা ভেবে থানাতেও একটি সাধারণ ডায়েরি করে রাখব। যে নার্সের অবহেলায় আমার ভাগ্নির শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী রোগীর মা আনজু আরা বেগম জানান, ২৫ এপ্রিল স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আমার মেয়ে আফসানাকে। তার পেটের ব্যথার কারনে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসক। তাকে ভর্তি করা হলে অপারেশন কথা বলেন। তার কোন রক্তের প্রয়োজন ছিল না। রক্তের কোনো কথাও বলেনি চিকিৎসক। হঠাৎ করেই নার্স রক্ত নিয়ে এসে শরীরে দেওয়া শুরু করেন। রোগীর তো রক্তের কথা বলে নাই। তখন ওই নার্স খারাপ আচারণ করে বলেন আমার চেয়ে বেশি বুঝেন। আমার চেয়ে বুঝবেন না। এই বলে আমার মেয়ের শরীরে রক্ত দেওয়া শুরু করেন তিনি। ২০ মিলি মিটার রক্ত শরীরে যাওয়ার পর নজরে পড়ে সেই রক্তটি “ও” পজেটিভ। কিন্তু আমার মেয়ের তো রক্তের গ্রুপ “এ” নেগেটিভ। তখন রক্ত দেওয়া বন্ধ করা হয়। এখন তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক চিকিৎসক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান সোহান এ প্রতিবেদককে বলেন, চৌদ্দ বছরের এক শিশুকে এপেন্টিসাইডের অপারেশন করা হয়েছে। অবজারভেশনে থাকাবস্থায় নার্সের গাফিলতির কারনে ভুলবশত: “ও” পজেটিভ রক্ত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা জানার পরেই আমরা রক্ত দেওয়া বন্ধ করা হয়। সম্পন্ন রক্ত শরীরে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে যেত। পরে তাকে ডাক্তারের অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। এখন রোগীর অবস্থা ভাল আছে। নার্সের গাফিলতির কারণে ওই রোগীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোশায়েরুল ইসলাম সুমনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত করে ওই নার্সের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জাহাঙ্গীর সেলিম : সম্পাদক, বাংলারচিঠিডটকম 


















