২০ শে জুন ২০২৬ ছিল বাবা দিবস। এ প্রেক্ষিতে বাবাকে নিয়ে আমার এই অনুভূতিমালা। আমার বাবা মোহাম্মদ আবদুর রহিম ছিলেন এক সংগ্রামী মানুষ। তিনি আমার জীবনে পথচলার আদর্শ, আমার শিক্ষাগুরু। ২০১১ সালের ৮ই জুন শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আমরা তার অভাব খুব অনুভব করি।
অসম্ভব সংগ্রামী ছিল তার জীবন। তিনি সংগ্রাম করে জীবিকা নির্বাহ করতে ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় সবচেয়ে বর্ণাঢ্য গৌরবময় স্মৃতি হচ্ছে বাবার স্নেহ সান্নিধ্য ও স্পর্শের স্মৃতি। তার উপদেশ, ভালোবাসা এবং স্মৃতি আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমি একাদশ ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম (উল্লেখ্য, বাবার প্রথম স্ত্রীর পক্ষে আমরা এক ভাই ও দুই বোন এবং তার প্রথম স্ত্রী ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় বিবাহ করেন তিনি। দ্বিতীয় পক্ষে আমরা সাত ভাই ও এক বোন)। বাবার স্বপ্ন ছিল আমরা যেন কেউ ডাক্তার হই, প্রতি সপ্তাহে গ্রামে গিয়ে বিনা মূল্যে গরিব মানুষের জন্য চিকিৎসা দেই। সেটা আমরা কেউ হতে পারিনি।
বাবার জন্ম গ্রামে ও আমৃত্যু গ্রামেই কেটেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্মতারিখ ১৯৩৭ সালের ১১ই এপ্রিল জামালপুর জেলার মেলান্দহের খাশিমারা গ্রামের এক কৃষিজীবী পরিবারে। জাতীয় পরিচয় পত্রের জন্মতারিখের সঙ্গে তার প্রকৃত জন্মতারিখের কিছুটা ব্যবধান রয়েছে। তার জন্ম অন্তত আরো আট-দশ বছর পেছনের দিক হবে। তার পিতার নাম মোহাম্মদ কসিম উদ্দিন ও মাতার নাম কালোজান।
কৃষি কাজের মধ্য দিয়েই তার কর্মজীবন শুরু। আমৃত্যু তিনি কৃষি কাজই আঁকড়ে ধরে ছিলেন। তিনি জীবনভর ছিলেন গভীর আশাবাদী। আমাদের পরিবারটি বড়। তিনি আমাদেরকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি নিরক্ষর ছিলেন, তবে ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তার উৎসাহে আমরা এগারো ভাইবোনের মধ্যে সাত জনই দেশের বিভিন্ন নামকরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি।
তার নামে গ্রামের বাড়িতে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি রয়েছে। পাঠাগারটির নাম মোহাম্মদ আবদুর রহিম পাঠাগার। আজ যে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ— তা আজকের বাংলাদেশ নয়, এটা আবহমানকালের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে অনেক মানুষের মেধা, শ্রম ও আত্মত্যাগ রয়েছে। ইতিহাস যদি সবই লিখে রাখবে তো তাদের কথা কেন নয়? তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ অংশগ্রহণ করেননি বটে, তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা-আশার সঞ্চার করেছেন।
কোনো আলোক রশ্মি যত ছোটই হোক না কেন, কোনো কিছুর ভেতর দিয়ে তার রেখাপাত করবেই। তিনি মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির ইসলামের উদার মতাদর্শ সুফিবাদের অনুসারী ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক চর্চা করতেন। তার জীবনদর্শন ছিল প্রগতিভাবাপন্ন। জামালপুর জেলার কেন্দুয়া কালিবাড়ী ও ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে তার এক ওস্তাদ ছিলেন। তার নামটি এই মুহূর্তে আমার মনে নাই। আমি বাবার সঙ্গে সেখানে শিশুকালে এক-দুবার গিয়েছি।
কোনো কোনো সময় বাড়ি থেকে তার জন্য গ্রামের আল পথ ধরে শস্য ক্ষেতে সকালে বা দুপুরের খাবার নিয়ে গেলে তিনি খেতে বসলে আমাদেরকেও খেতে দিতেন। বাড়িতে বিড়াল ও কুকুর খাবার সময় ঘুরাঘুরি করলে তিনি খাবার দিতেন। তিনি নিজ বাড়িকে খুব ভালোবাসতেন এবং তিনি এখানেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন। এমনি জানা-অজানা অনেক মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক এবং অফিসার, বাংলা একাডেমি, ঢাকা
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক 


















