একজন মানুষ তার জীবনের কয়েকটি স্মৃতি কখনোই বিস্মৃত হয় না। যেমন- জন্মস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ইত্যাদি। তেমনি আমার জীবনেও কয়েকটি স্মৃতি আমার বোধের সঙ্গে মিশে রয়েছে। তার একটি এই নিবন্ধে তুলে ধরেছি।
আজ থেকে ২৪-২৫ বছর আগে আমরা যখন ২০০১ সালে জামালপুর জেলার মেলান্দহে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মাহমুদপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর এইচএসসিতে কোথায় ভর্তি হব এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সেই সময়ে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারি কলেজে ভর্তি হতে হতো। ২০০১ সালে আমাদের সময়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ বা গ্রেডিং পদ্ধতিতে পরীক্ষা চালু হয়। ইংরেজিও comprehension পদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষা চালু হয়। গ্রেডিং পদ্ধতি ২০০৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষার স্তরেও এটি চালু থাকে। এভাবে বাংলাদেশে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়। জাতি পরিচিত হতে শুরু করে জিপিএ পদ্ধতির সঙ্গে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু নম্বর দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। পরিবর্তন আনা হয় ফলাফলের প্রকাশ ভঙ্গিতে। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ এ অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে আমাদের শিক্ষার্থীদের ফলাফলে ক্ষতি হয় ।

সেই সময় আমাদের মাহমুদপুর হাই স্কুলের দু-একজন বন্ধু ঢাকায় নামকরা কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তবে অধিকাংশই বন্ধু জামালপুরের বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়েছে। আমার সহোদর বড় দুই ভাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ছাত্র ছিলেন। আমিও এ কলেজে এইচএসসি ২০০১-২০০২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হই। এরপর জামালপুরে কোথায় থাকব এই নিয়ে ভাবনা এলো। কলেজের হোস্টেলে না থাকতে পেরে আমি কিছুদিন জামালপুর শহরের শেখের ভিটায় মেসে থেকেছি। তখন শহরের স্টেশন রোডে হায়দার মল্লিকের বাড়ি সংলগ্ন শফি মিয়া বাজারে আমাদের মনিহারি দোকান দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চলেছিল। এ উপলক্ষ্যে দোকানের জন্য কাঠের শেলফসহ নানা দ্রব্যাদি তৈরি করা হয় এবং কয়েক দিন ব্যবসাও চালু থাকে। পরে ব্যবসাযর ইতি ঘটে। দোকানের নানা দ্রব্যাদি পরে ভ্যানে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এখনো গ্রামের বাড়িতে দোকানের দুই একটি জিনিস তার স্মৃতি বহন করছে। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে আমাদের সমকালের অনেক সহপাঠী বন্ধুদের নাম স্পষ্ট মনে নেই, তবে চেহারা মনে আছে অনেকের। এদের কারো কারো সাথে আমার এখনো কথা হয়। তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
২০০২ সালে আমার ছোট ভাই শাহ্ মোহাম্মদ কবীর (বর্তমানে অ্যাডভোকেট, জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ কোর্ট) জামালপুর জিলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলে আমরা তখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আমলাপাড়ায় মোহাম্মদ রেজা খান সাহেবের বাসায় ভাড়া থাকতাম। আমাদের সঙ্গে আমার আরেক ছোট ভাই শাহ্ বুলবুলও মাঝেমধ্যে থাকত এবং গ্রাম থেকে আমার আরেক ছোট ভাই শাহ্ সাদেক আমাদের জন্য খাদ্রসামগ্রী নিয়ে আসত। এ বাসায় আমরা অনেকদিন ছিলাম। এখান থেকে কবীর জিলা স্কুলে পড়ত। এখানে থাকার সময় জামালপুর শহরের আমলাপাড়াসহ শহরের অন্যান্য এলাকার অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, আমলা, মোক্তার, অ্যাডভোকেটদের সান্নিধ্যে এসেছি, অনেকের নাম শুনেছি। এরা অনেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। সে সময় বন্দে মাতরম, কুইট ইন্ডিয়া এবং লরকে লেঙ্গে পাকিস্তান স্লোগান দেওয়া অনেক ব্যক্তিসহ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অনেক সংগঠক, রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে।
জামালপুর শহরের আমলাপাড়া কেবল একটি এলাকা নয়, এটি অনেক কৃতী সন্তানের স্মৃতি ও ঐতিহ্যবাহী। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী ও সবুজে ঘেরা এ শহরের এ অঞ্চলটি তার শান্ত পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক আবহের জন্য স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আমলাপাড়া-দেওয়ানপাড়া পাক-ভারত ইতিহাসের অনন্য স্মৃতি বহন করে চলেছে।
শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ সে সময়ও সারা বছর পানি থাকত। বর্তমানে এটি প্রায় মৃত। এ নদের সঙ্গে জামালপুর শহরের প্রধান সড়ক সংলগ্ন বেশ কয়েকটি ঘাট ছিল। যেমন- গুদারা ঘাট, স্কুল ঘাট, মিউনিসিপিলিটি ঘাট, আব্বাস মিয়ার ঘাট (বাগু মিয়ার পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত), কালীঘাট, ফেরী ঘাট, শ্মশান ঘাট, এসডিও ঘাট, চাপাতলা ঘাট, ওয়াপদা ঘাট ইত্যাদি ঘাটের মধ্যে কয়েকটি দেখেছি। তখনো ঘাটগুলোর সরব ব্যস্ততার উপস্থিতি ছিল। শহরের আমলাপাড়া-দেওয়ানপাড়া এলাকায় বেশকটি নামকরা বাড়ি ছিল। তন্মধ্যে প্রখ্যাত নাট্যকার-চলচ্চিত্রকার আবদুল্লাহ আল মামুনের স্মৃতিবিজড়িত ফাতেমা ভিলা অন্যতম। আবদুল্লাহ আল মামুনের পিতা এএইচএম আব্দুল কুদ্দুস তদানীন্তন আশেক মাহমুদ কলেজের (বর্তমানে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ) দ্বিতীয় প্রিন্সিপাল ছিলেন।

জামালপুর শহরের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এই এলাকা সবসময়ই এগিয়ে ছিল। রেজা খানের বাড়ির উত্তর দিকে ফয়েজ মোক্তারের বাড়ি (কবি আহমদ আজিজের বাবা), আমাদের সমকালে ঐ বাড়ির বিপরীতে টেনিস গ্রাউন্ডের সঙ্গে অফিসার্স ক্লাবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি জামালপুরের কার্যক্রম চলেছিল এবং রেজা খানের বাড়ির সঙ্গে বাম দিকে তখন জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম চালু ছিল। তারও আগে এ গ্রন্থাগার জিলা স্কুলের বিপরীতে মসজিদ সংলগ্ন অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিম ও স্পিকার আব্দুল করিম সাহেবের বাড়ির পার্শ্ব সংলগ্ন ছিল। ফয়েজ মোক্তারের বাড়ি থেকে অদূরে দেওয়ানপাড়া মোড় সংলগ্ন মোসাহেব আলী খান (এ. এ. কে. মাহমুদুল হাসান দারার বাবা) ও গফুর মোক্তারের বাড়ি (কবি ও গবেষক মু. আজিজুর রহমানের বাবা) এবং কফিল উদ্দিন মোক্তার (ডা. ফখরুজ্জামানের বাবা) প্রমুখের এই বাড়িগুলোতে আমাদের যাওয়া-আসা ছিল। রেজা খানের বাড়ির পূর্বদিকে মির্জা হাউস। আমার লেখা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার : জীবন ও কর্ম গ্রন্থের উৎসকেন্দ্র মির্জা হাউস। এই গ্রন্থটিতে আমলাপাড়ার ছাপ পরতে পরতে রয়েছে। আমার অন্য আরেকটি লেখা জামালপুরের মোক্তার বৃত্তান্ত নামক অণুনিবন্ধেও এর কিছুটা বর্ণনা করেছি।
আমলাপাড়ার বাসিন্দা রেজা খানের সঙ্গে আমাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। রেজা খান ছিলেন জামালপুর পৌরসভা ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদের একজন সংসদ সদস্য। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন এবং তৎকালীন সময়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ।

রেজা খানের সঙ্গে আমাদের মধুর সম্পর্ক ছিল। আমরা শেষ জীবনে তার বাড়িতে ভাড়া থাকাকালে তিনি আমাদের সঙ্গে অভিভাবক ও বন্ধুসুলভ আচরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে তার রাজনীতির জীবনের গল্প বলতেন। তার কথা বলা, সাহসিকতা ইত্যাদি আকর্ষণ করলেও কিছু কিছু ছেলেমানুষী ব্যবহার ভালো লাগেনি। তার কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে আমরা ভিন্ন মত পোষণ করতাম। তিনি আমৃত্যু আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।
আমলাপাড়াসহ শহরের অন্যান্য এলাকার সেই সময়কালের অনেক ব্যক্তি আজ আর বেঁচে নেই। আরও মনে পড়ে সেই সময় বকুলতলার পাবলিক লাইব্রেরিতে আমাদের সরব উপস্থিতি ছিল। এ লাইব্রেরির আমরা ছাত্র সদস্য ছিলাম। বিকেল হলে আমরা সেখানে পড়তে যেতাম এবং ফেরার সময় বই ইস্যু করে আনতাম। সেই সময় পাবলিক লাইব্রেরির কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। কবি, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী আলী জহির যার প্রকৃত নাম আলী জহির খালিকুজ্জামান। তিনি রেজা খানের বাসায় ভোট চাইতে এসেছিলেন। আমরা তখন বাসায় উপস্থিত ছিলাম। জহির ভাইয়ের সমর্থনে এ নির্বাচনে আমরা যথেষ্ট শ্রম দিয়েছিলাম এবং তিনি একটি পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে আমি ঢাকায় চলে এলে কবীর জিলা স্কুলের হোস্টলে উঠে। এরই সাথে আমার জামালপুরে থাকার পর্ব ইতি ঘটে।
আজ ২৩-২৪ বছর হলো জামালপুর শহর ছেড়ে এসেছি। কখনোসখনো মনের অজান্তে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। সব নাম এখন আর মনে নেই। তবু স্মৃতিতে গেঁথে আছে এই শহরের বাসিন্দার অনেকের নাম। এ শহর আমার ভালো লাগার, স্বপ্নের। আজকের নবীন প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না যে, সেই সময়ে আমাদের জামালপুর শহরটা কেমন ছিল? এখন জামালপুর মানেই বিল্ডিং, অটো রিক্সার জ্যামের শহর। অথচ এই জামালপুর ছিল এক সময় গাছগাছালিতে ভরা। শহরটা অনন্য প্রাণবন্ত ছিল। শান্তিনিকেতনের পরিবেশের ন্যায় অনিন্দ্য সুন্দর সেই সময়ের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে অধ্যয়ন ও আমলাপাড়া-দেওয়ানপাড়ার মানুষের সঙ্গে আমাদের এই মধুর স্মৃতি অম্লান যা সৃষ্টিশীল নবীন প্রজন্মের কাছে সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : গবেষক ও প্রাবন্ধিক। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি



















