≡ শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ≡
[‘নজরুল বর্ষ’ (২৫ মে ২০২৬ খ্রি. — ২৫ মে ২০২৭ খ্রি. পর্যন্ত) ঘোষণা করেছে সরকারl জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টি আমাদের চিরদিনের অনুপ্রেরণা। তাঁর স্মরণে এ অণুনিবন্ধ বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন মাত্র।]
১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু-’র দ্বাদশ সংখ্যায় তাঁর রচিত ৭৯ পঙ্ক্তির দীর্ঘ রাজনৈতিক কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে এবং ২০ অক্টোবর পঞ্চদশ সংখ্যায় ১১ বছর বয়সী শ্রীলীলা মিত্রের লেখা বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ সরকার ধূমকেতু-র এই দুটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং কবি নজরুল ও মুহাম্মদ আফজালুল হকের বিরুদ্ধে তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১২৪ক (রাষ্ট্রদ্রোহ) ও ১৫৩ক (সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টির অভিযোগ) ধারায় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলার জন্য তৎকালীন আইনে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়েছিল যা বর্তমানেও আইনগতভাবে বলবৎ রয়েছে।
কবি নজরুলের সমকালে ব্রিটিশ রাজের শাসন থাকায় ব্রিটিশ ভারতে রাষ্ট্রপক্ষের ফৌজদারি মামলা সাধারণত ‘The Emperor Vs Accused’ নামে হতো। কারণ এ ধরনের মামলার ফরিয়াদি পক্ষ স্বয়ং রাষ্ট্র বা রাজা। সমকালে কোনো কোনো মামলা ঘটনার নামে পরিচিতি পেয়েছিল। যেমন- The Emperor Vs Aurobindo Gosh and others যা ইতিহাসে Alipore Bomb Case নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল। আরও একটি বিখ্যাত মামলা The Emperor Vs Khudiram Bose চেয়ে ক্ষুদিরামের মামলা নামে সমধিক পরিচিত ছিল। কবি নজরুলের মামলাটিও সমকালে ধূমকেতু মামলা বা ‘The Emperor Vs Kazi Nazrul Islam and Others’ নামে ব্যাপক পরিচিত পায়।
ধূমকেতু মামলায় ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বরে আফজালুল হক ও ২৩ নভেম্বর কবি নজরুল গ্রেফতার হন। কিছুদিন হাজতি হিসেবে থাকার পর আফজালুল হক জামিনে মুক্তি লাভ করেছিলেন। পরে তার আত্মীয় তদানীন্তন কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট উকিল (পরবর্তীকালে স্যার) আজিজুল হকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের এপ্রুভার সাক্ষী হয়ে তিনি অব্যাহতি পান। কিন্তু কবি নজরুলের জামিন মঞ্জুর না হওয়ায় কিছুকাল হাজতি হিসেবে কারাগারে অবস্থান করেন। আলোচিত এ মামলাটি সপ্তাহখানেক পরে ২৯ নভেম্বর শুনানি শুরু হয়ে ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ইংরেজ কবি সুইন হো’র রায়ে কবি নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি সমকালে আপিল আদালত কলকাতা হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল দায়ের করেননি যা বর্তমানেও আইনগতভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ ধারার ক্ষেত্রে পরবর্তী আপিল কোর্ট হিসেবে হাইকোর্টে আপিলের নিয়ম বলবৎ রয়েছে। আপিল হলে এ মামলার রায় কোড অভ রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষিত হতো।
কবি নজরুলের কারাজীবনের দিনগুলোর বিভিন্ন সময় প্রেসিডেন্সি, আলিপুর সেন্ট্রাল, হুগলি ও বহরমপুর জেলে অতিবাহিত হয়। ১৯২৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কাজী নজরুল কারাবিধি অনুযায়ী বহরমপুর জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। তিনি ১৯২২ সালের ২৩শে নভেম্বর গ্রেফতারের দিন থেকে ১৯২৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত মোট ৫৪ দিন হাজতবন্দি এবং ১৯২৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি থেকে ১৯২৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর মুক্তির দিন পর্যন্ত মোট ৩২৩ দিন কয়েদি ছিলেন। সর্বমোট তিনি ৩৭৭ দিন কারাঅন্তরীণ ছিলেন।
জেলে যাওয়ার সমকালে কবি নজরুলের আলোকচিত্র ধূমকেতু পত্রিকা
কাজী নজরুল ইসলামের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ও কারাবরণ তার জীবনের এটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যময় ঘটনা। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা এখনো বিরাজমান। ইংরেজ শাসনামল ছিল ভারতবাসীর শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের দুঃসময়। কবি নজরুলের সমকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন এবং চৌরিচৌরা ঘটনা—যা তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজী নজরুল-মানসকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতির এই টালমাটাল সময়ে তিনি সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক জীবন থেকে দেশে ফিরে আসার পর সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন। বিদ্রোহ ও সংগ্রামী জীবন তাঁর ধমনিতে মিশে ছিল গভীর একাত্মতায়। জাতির প্রতি দায়বদ্ধতায় থেকেই নিজের ইচ্ছানুযায়ী পত্রিকায় লেখালেখির সুযোগ তৈরি করার জন্য নিজ উদ্যোগে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন।
কাজী নজরুল ইসলামের দেওয়া নাম ধূমকেতু পত্রিকা ১১ আগস্ট ১৯২২ প্রকাশিত হয়। তিনি সম্পাদক না লিখে ‘সারথি’ লিখতেন। বিপ্লব, কৃষক-মজদুর ও নিম্নমধ্যবিত্তের জাগরণ এবং ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ছিল পত্রিকাটির মূল লক্ষ্য। বিপ্লবীদের মধ্যে এ পত্রিকার প্রবল প্রভাব ছিল। এ পত্রিকা সম্বন্ধে ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা অভিমত ছিল-(Dhumketu) “Started from 11th August, 1922. Preaches emancipation from all restrains-Political, Social or religious, Independent in tone.”
কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ধুমকেতু মামলা বুঝতে হলে তার সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকাকে সর্বাগ্রে বুঝতে হবে। ‘ধূমকেতু’র গদ্য, বিশেষ করে সম্পাদকীয়র ভাষা ছিল তীব্র জ্বালাময়ী। ‘কালির বদলে রক্তে ডুবিয়ে লেখা’হতো-এর সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলো। তার সম্পাদকীয়র অংশত একটি নমুনা :
‘…সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজটরাজ মানি না। কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগরপারে পাড়ি দিতে হবে।’[উদ্ধৃতি : নজরুল রচনাবলী, অক্টোবর ২০১৮।। দ্বিতীয় খণ্ড।।রুদ্র-মঙ্গল।। পৃ. ৪২৮]
তৎকালীন ব্রিটিশ আইনে স্বাধীনতার দাবি রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হতো। নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’কবিতায় রূপকের মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সমকালীন নেতাদের ভূমিকা ফুটে ওঠে। গান্ধী, অরবিন্দ, চিত্তরঞ্জন, সুরেন্দ্রনাথসহ বহু নেতার প্রতীকী উল্লেখ কবিতাটিকে রাজনৈতিক প্রতিবাদী চেতনা ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে তুলে। এ কবিতার প্রথম স্তবকেই কাজী নজরুল তীব্র শ্লেষ, তির্যক বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গি ও জিজ্ঞাসু কণ্ঠে লিখেন :
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।
দেব-শিশুদের র্মাছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে,
রণাঙ্গনে নাম্বে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?
বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয়-বছরী ফন্দি-কারায়,
চক্র তাঁহার চরকা বুঝি ভণ্ড-হাতে শক্তি হারায়।
মহেশ্বর আজ সিন্দু-তীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে
অরবিন্দ-চিত্ত তাঁহার ফুটবে কখন কে সে জানে!
সদ্য অসুর-গ্রাসচ্যুত ব্রহ্মা চিত্তরঞ্জনে হায়
কমণ্ডলুর শান্তি-বারি সিঞ্চি যেন চাঁদ নদীয়ায়।
…
সুরেন্দ্র আজ মন্ত্রণা দেন দানব রাজার অত্যাচারে,
দম্ভ তাঁহার দম্ভোলি ভীম বিকিয়ে দিয়ে পাঁচ হাজারে।
রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে,
সে কর শুধু পশল না মা অন্ধকারার বন্ধ ঘরে।
গগন-পথে রবি-রথের সাত সারথি হাঁকায়-ঘোড়া,
মর্ত্তে দানব মানব-পিঠে সও্য়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।
বারী-ইন্দ্র বরুণ আজি করুণ সুরে বংশী বাজায়,
বুড়ি-গঙ্গার পুলিন বুকে বাঁধছে ঘাঁটি দস্যু-রাজায়। …
[উদ্ধৃতি : নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।। ফেব্রুয়ারি ২০১৮।। নবম খণ্ড।।অগ্রন্থিত রচনা]
বিচারের সময় কাজী নজরুল একটি বিবৃতি দেন যা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’নামে খ্যাত। এ জবানবন্দিতে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন বলতে নিজের কৃতকর্মের দায়িত্ব অস্বীকার করেননি; বরং তিনি যা করেছেন ঠিকই করেছেন। বিচারক সুইনহো যে একজন কবি ছিলেন সেটি কাজী নজরুল ইসলাম জানতেন। এই ইংরেজ বিচারক ও সিভিল সার্ভেন্টের নামকরণে কলকাতায় একটি রাস্তা আজো স্মৃতি বহন করেছে। জবানবন্দিতে কবি কাজী নজরুল লিখেছিলেন :
‘শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট। কিন্তু বেলা শেষের শেষ খেয়া এ প্রবীণ বিচারককে হাতছানি দিচ্ছে, আর রক্ত-ঊষার নবশঙ্খ আমার অনাগত বিপুলতাকে অভ্যর্থনা করছে; তাকে ডাকছে মরণ, আমায় ডাকছে জীবন; তাই আমাদের উভয়ের অস্ত-তারা আর উদয় তারার মিলন হবে কিনা বলতে পারি না।
…আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না। এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো একি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়ত সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসনক্লিষ্ট বন্দী সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী?
[উদ্ধৃতি : নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।। ফেব্রুয়ারি ২০২০।। প্রথম খণ্ড।।রাজবন্দী জবানবন্দী।। পৃ. ৪৩১]
তাঁর এই বিপ্লবী জবানবন্দি আদালতে গৃহীত হয়নি।
কারাজীবনেও কাজী নজরুল সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। ধূমকেতু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা তাঁর দ্রোহী চেতনা ও ঔপনিবেশিকবিরোধী সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদের প্রেরণা আজও প্রাসঙ্গিক। তাই নজরুলের জীবন ও উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বুঝতে ধূমকেতু মামলা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক এবং নজরুলের কারাজীবনের ওপর প্রথম গ্রন্থাকার
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক 












