ঢাকা ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধে দরকার সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ

ভুল ও জাল জন্মনিবন্ধনের ছোবলে কিশোরী আসমা (ছদ্মনাম), কপালে জুটে বিভীষিকা

বাংলাদেশে ভুল ও জাল জন্মনিবন্ধন (False Birth Registration) শিশু সুরক্ষার একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বয়স, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার পরিচয় ও জন্মস্থানের ভুল তথ্য শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। শিশু পাচার ও অভ্যন্তরীণ শিশু যৌন শোষণ (CST) প্রতিরোধে এই সমস্যা অবিলম্বে সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা অপরাজেয় বাংলদেশ।

এই লক্ষ্যে অপরাজেয়-বাংলাদেশ “দি ফ্রিডম ফান্ডের” অর্থায়নে “বাংলাদেশের যৌন নির্যাতন ও পাচারের শিকার শিশুদের সুরক্ষা বৃদ্ধি” শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।

বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন না থাকা শিশুদের জন্য ভুয়া বা অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, প্রশিক্ষণহীনতা এবং “অপ্রাপ্য (Oprappo)” অপশনের ভুল বা সীমিত ব্যবহারের কারণে এই অনিয়ম আরও বাড়ছে। ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় সার্ভার জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্বও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।

জন্মনিবন্ধন জটিলতার কারণে দেশের অনেক শিশুর জীবনের সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এমন এক কন্যাশিশুকে তার স্বাভাবিক জীবন থেকে আজ যৌনকর্মী হয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটাতে হচ্ছে। লালমনিরহাট জেলার ওই কন্যাশিশু আসমার (ছদ্মনাম) জীবনের সত্য ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অন্ধকার জগতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।

উত্তরের জেলা লালমনির হাটের বাসন্দিা আসমা। চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় সন্তান আসমা। কষ্টের সংসারে তার জন্ম। দু’বেলা তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে না তার দিনমজুর বাবা। ঘরে আছে অসুস্থ মা। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটে গোলাপের পাঁপড়ির মতো ফুটফুটে শিশু আসমার। কুঁড়েঘরে চান্দের আলোর মতো স্বপ্ন দেখে তার বাবা-মা। তাই আসমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ দিতে পারে না আসমা। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী যেন গদ্যময়। আসমা সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকে। দুমুঠো খাবারের তাড়নায়। ক্ষুধার জ্বালায় পড়ায় মনযোগ দিতে পারে না সে।

এক ঘটনায় আসমার জীবনে শুরু হয় এক বিভ্রান্তিময় ভবিষ্যৎ। নষ্ট দুর্গন্ধময় স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার এক কলঙ্কিত জীবনপ্রবাহ। সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আসমার চোখের কাজল লেপটে যায়। হৃদয়ের কান্না যেন বহমান স্রোতস্বিনী খরস্রোতা নদীর মতো বইতে থাকে। কান্নায় থরথরে কাঁপতে থাকে তার মুখাবয়ব। আজ সে ভাষা হারিয়ে ফলেছে নির্মম অতীতের বর্ণনা দিতে গিয়ে।

আসমার বয়স তখন ১২/১৩ বছর হবে। সেই দিন তাদের ঘরে খাবার না থাকায় আসমা না খেয়েই স্কুলে চলে যায়। একদিকে ক্ষুধার যন্ত্রনায় দিশেহারা। অন্যদিকে স্যারের বেত্রাঘাত আসমার ধর্য্যের বাধকে ক্ষণিকেই তছনছ করে ফেলে। সে রাগ আর অভিমানে স্কুল থেকে পালিয়ে বাড়িতে চলে আসে। আর সিদ্ধান্ত নেয় অজানা এক স্বপ্নের রাজ্যে বাসা বাঁধবে। যেখানে থাকবে না ক্ষুধার যন্ত্রণা।

তাই সে পাড়ি দেয় অজানা এক স্বর্গরাজ্যের পথে। লালমনিরহাট থেকে ট্রেনে উঠে অজানার পথে। একসময় সে এসে পৌঁছায় নাল-নীল বাতি ও সুউচ্চ অট্রালকিার শহর ঢাকায়। আসার পর ভাগ্যক্রমে পড়ে যায় বড় লোক এক বাসার মালিকের কাছে। কাজের মেয়ে হিসাবে আশ্রয় পায় সেই বাসায়। স্বপ্নের ডানায় ভর করে আসমা স্বাচ্ছন্দে দিন কাটায়। তার কাছে হেরে যায় দরদি বাবার দুবেলা মুখে খাবার না তুলে দেওয়ার অক্ষমতা।

কে জানতো স্বপ্নের বাসর ঘরটাই ক্ষণিকের তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। টগবগে কিশোরী আসমার প্রতিবিম্ব গিয়ে পড়ে তার মালিকের উপর। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আসমার সেই ঝলমলে গোলাপের পাঁপড়ির মতো কোমল দেহের উপর। ক্ষণিকেই ভেঙে যায় তার স্বপ্নের সোনালী জীবনের অধ্যায়। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার। ভদ্রবেশী সমাজপতির লালসার শিকার হয়ে আসমার জীবনের শেষ অবস্থান হয় নিগৃহীত ও ঘৃণীত যৌন কাজে। আসমার জীবনও কবিতার লাইনরে মতো ছন্দময় হতে পারতো। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সে আজ যৌনর্কমী।

আসমার বাসার মালিক জোর করে তাকে যৌন কাজে বাধ্য করে। স্বপ্নবিলাসী জীবনটি ধুলায় মিশিয়ে দেয়। কোমলমতি আসমা এই নৃশংসতা মেনে নিতে না পেরে সেখান থেকে পালিয়ে তার বাড়ি লালমনিরহাট যাওয়ার জন্য ঢাকার মহাখালী বাসট্যান্ডে আসে। কান্নারত অবস্থায় তার গতিবিধি দেখেই নজরে পড়ে যায় পাচারকারী সদস্যদের। কৌশলে তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাসে উঠায় এবং নিয়ে আসে জামালপুরের যৌনপল্লীতে। তাকে বিক্রি করে দেয় এক সরদারনীর কাছে।

কিন্তু সরদারনী আসমার বয়স কম হওয়ায় সুকৌশলে তাকে ঘরে বন্দি করে রাখে। যৌন কাজ করার জন্য চরম নির্যাতন করতে থাকে। এই বদ্ধ ঘরে এক বছর অতি মানবতের জীবন কাটে আসমার। পরবর্তীতে আসমার বয়স বাড়িয়ে ভূয়া জন্মনিবন্ধ তৈরি করে। সেই জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে লাইসন্সে করে যৌন কাজে বাধ্য করা হয় তাকে। শুরু হয় আসমার ট্র্যাজেডি জীবনের আর এক অধ্যায়।

ফুটফুটে কিশোরী আসমা যেন হাজারো ক্ষুধার্ত বাঘের খাবারে পরিনত হয়। চারদিকে কড়া পাহারায় রেখে জমজমাট ব্যবসা করে যায় সেই সরদারনী। আসমা কৌশলে অনেক চেষ্টা করে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনের গল্প সাজাতে চয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টায় নিয়তির নির্মমতার কাছে হেরে যায়। আর সে হয় একজন কমপ্লিট যৌনর্কমী।

আসমা তার জীবনের নির্মমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় লুটিয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে ভাষার ছন্দ। জীবনের সুন্দর স্বপ্নগুলো শুকিয়ে নিথর পাথর হয়ে যাওয়ায় আজ আর কোন অর্জনই তার অবশষ্টি নেই। ব্যর্থতার কান্নাই যেন তার শেষ পরিচয়।

কিছুদিন পরইে তার কোলে আসে একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। মেয়েটি বড় হতে থাকলে সে সিদ্ধান্ত নেয় মেয়ে যেন তার মতো ডাস্টবিনে পড়ে থাকা শিয়াল কুকুরের খাবারে পরিনত না হয়। তাই মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা তার পিছু ছাড়েনি। মেয়েটিও যৌন পাচারের শিকার হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করে অপরাজয়ে-বাংলাদশে জামালপুর শেল্টার হোমে নিয়ে আসে। শুরু হয় সন্তানের ভবষ্যিত নিয়ে আর এক যুদ্ধ। বর্তমানে সন্তানই তার জীবনের নির্জাস। তার সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করেই সন্তানের পরিচয়ে সে বেঁচে থাকতে চায়। এটাই তার জীবনের শেষ চাওয়া। আসমার শেষ কথা- কোন মেয়ে যেন সোনালী সারথী জীবনকে বীভৎস ধ্বংস স্তূপে পরিনত না করে। কারো স্থান যেন না হয় এই নিষিদ্ধপল্লীতে।

এদিকে ওই অসহায় কন্যাশিশু আসমারসহ এমন অনেক শিশুদের বিষয়ে অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে আসে করুণ জীবন কাহিনী। যেসব কারণে ভুল জন্মনিবন্ধনের কারণে নাগরিক অধিকার পেতে এমন অনেক শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দেয়, সেগুলো হলো- জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাচার ও শোষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আইনি সহায়তা ও কেস ম্যানেজমেন্টে জটিলতা তৈরি হয়। বয়সভিত্তিক সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় না। বিশেষত ঈঝঞ – এর শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক জন্মনিবন্ধন না থাকায় পুনরায় শোষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষায় অপরাজেয়-বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সুপারিশ তৈরি করে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহবান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, অপ্রাপ্য শিশুদের সর্বোত্তম সুরক্ষার জন্য ১. জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে শিশুবান্ধব ও সারভাইভার-সেনসিটিভ করতে হবে। ২. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও রেজিস্ট্রারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ৩. অপ্রাপ্য (Oprappo) অপশনের ব্যবহার সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন। ৪. সামাজিক সুরক্ষা, রেফারেল সেবা ও জন্মনিবন্ধনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অপরাজেয় বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে বাস্তব যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো : ১. জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতি রোধে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা। ২. যেকোনো সংশোধনের জন্য বাধ্যতামূলক হলফনামা ও ডকুমেন্টারি যাচাইকরণ। ৩.ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ফি মওকুফ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিতকরণ। ৪. কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ। এবং ৫. সরকার ও এনজিও সমন্বয়ে রেফারেল ও ফলোআপ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা দরকার।

সংস্থাটির মতে, সঠিক জন্মনিবন্ধনই হলো শিশুর পরিচয়, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ভিত্তি। ভুল জন্মনিবন্ধন বন্ধে অবিলম্বে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সময়।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধে দরকার সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ

ভুল ও জাল জন্মনিবন্ধনের ছোবলে কিশোরী আসমা (ছদ্মনাম), কপালে জুটে বিভীষিকা

আপডেট সময় ১০:১৪:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে ভুল ও জাল জন্মনিবন্ধন (False Birth Registration) শিশু সুরক্ষার একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বয়স, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার পরিচয় ও জন্মস্থানের ভুল তথ্য শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। শিশু পাচার ও অভ্যন্তরীণ শিশু যৌন শোষণ (CST) প্রতিরোধে এই সমস্যা অবিলম্বে সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা অপরাজেয় বাংলদেশ।

এই লক্ষ্যে অপরাজেয়-বাংলাদেশ “দি ফ্রিডম ফান্ডের” অর্থায়নে “বাংলাদেশের যৌন নির্যাতন ও পাচারের শিকার শিশুদের সুরক্ষা বৃদ্ধি” শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।

বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন না থাকা শিশুদের জন্য ভুয়া বা অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, প্রশিক্ষণহীনতা এবং “অপ্রাপ্য (Oprappo)” অপশনের ভুল বা সীমিত ব্যবহারের কারণে এই অনিয়ম আরও বাড়ছে। ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় সার্ভার জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্বও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।

জন্মনিবন্ধন জটিলতার কারণে দেশের অনেক শিশুর জীবনের সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এমন এক কন্যাশিশুকে তার স্বাভাবিক জীবন থেকে আজ যৌনকর্মী হয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটাতে হচ্ছে। লালমনিরহাট জেলার ওই কন্যাশিশু আসমার (ছদ্মনাম) জীবনের সত্য ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অন্ধকার জগতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।

উত্তরের জেলা লালমনির হাটের বাসন্দিা আসমা। চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় সন্তান আসমা। কষ্টের সংসারে তার জন্ম। দু’বেলা তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে না তার দিনমজুর বাবা। ঘরে আছে অসুস্থ মা। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটে গোলাপের পাঁপড়ির মতো ফুটফুটে শিশু আসমার। কুঁড়েঘরে চান্দের আলোর মতো স্বপ্ন দেখে তার বাবা-মা। তাই আসমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ দিতে পারে না আসমা। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী যেন গদ্যময়। আসমা সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকে। দুমুঠো খাবারের তাড়নায়। ক্ষুধার জ্বালায় পড়ায় মনযোগ দিতে পারে না সে।

এক ঘটনায় আসমার জীবনে শুরু হয় এক বিভ্রান্তিময় ভবিষ্যৎ। নষ্ট দুর্গন্ধময় স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার এক কলঙ্কিত জীবনপ্রবাহ। সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আসমার চোখের কাজল লেপটে যায়। হৃদয়ের কান্না যেন বহমান স্রোতস্বিনী খরস্রোতা নদীর মতো বইতে থাকে। কান্নায় থরথরে কাঁপতে থাকে তার মুখাবয়ব। আজ সে ভাষা হারিয়ে ফলেছে নির্মম অতীতের বর্ণনা দিতে গিয়ে।

আসমার বয়স তখন ১২/১৩ বছর হবে। সেই দিন তাদের ঘরে খাবার না থাকায় আসমা না খেয়েই স্কুলে চলে যায়। একদিকে ক্ষুধার যন্ত্রনায় দিশেহারা। অন্যদিকে স্যারের বেত্রাঘাত আসমার ধর্য্যের বাধকে ক্ষণিকেই তছনছ করে ফেলে। সে রাগ আর অভিমানে স্কুল থেকে পালিয়ে বাড়িতে চলে আসে। আর সিদ্ধান্ত নেয় অজানা এক স্বপ্নের রাজ্যে বাসা বাঁধবে। যেখানে থাকবে না ক্ষুধার যন্ত্রণা।

তাই সে পাড়ি দেয় অজানা এক স্বর্গরাজ্যের পথে। লালমনিরহাট থেকে ট্রেনে উঠে অজানার পথে। একসময় সে এসে পৌঁছায় নাল-নীল বাতি ও সুউচ্চ অট্রালকিার শহর ঢাকায়। আসার পর ভাগ্যক্রমে পড়ে যায় বড় লোক এক বাসার মালিকের কাছে। কাজের মেয়ে হিসাবে আশ্রয় পায় সেই বাসায়। স্বপ্নের ডানায় ভর করে আসমা স্বাচ্ছন্দে দিন কাটায়। তার কাছে হেরে যায় দরদি বাবার দুবেলা মুখে খাবার না তুলে দেওয়ার অক্ষমতা।

কে জানতো স্বপ্নের বাসর ঘরটাই ক্ষণিকের তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। টগবগে কিশোরী আসমার প্রতিবিম্ব গিয়ে পড়ে তার মালিকের উপর। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আসমার সেই ঝলমলে গোলাপের পাঁপড়ির মতো কোমল দেহের উপর। ক্ষণিকেই ভেঙে যায় তার স্বপ্নের সোনালী জীবনের অধ্যায়। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার। ভদ্রবেশী সমাজপতির লালসার শিকার হয়ে আসমার জীবনের শেষ অবস্থান হয় নিগৃহীত ও ঘৃণীত যৌন কাজে। আসমার জীবনও কবিতার লাইনরে মতো ছন্দময় হতে পারতো। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সে আজ যৌনর্কমী।

আসমার বাসার মালিক জোর করে তাকে যৌন কাজে বাধ্য করে। স্বপ্নবিলাসী জীবনটি ধুলায় মিশিয়ে দেয়। কোমলমতি আসমা এই নৃশংসতা মেনে নিতে না পেরে সেখান থেকে পালিয়ে তার বাড়ি লালমনিরহাট যাওয়ার জন্য ঢাকার মহাখালী বাসট্যান্ডে আসে। কান্নারত অবস্থায় তার গতিবিধি দেখেই নজরে পড়ে যায় পাচারকারী সদস্যদের। কৌশলে তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাসে উঠায় এবং নিয়ে আসে জামালপুরের যৌনপল্লীতে। তাকে বিক্রি করে দেয় এক সরদারনীর কাছে।

কিন্তু সরদারনী আসমার বয়স কম হওয়ায় সুকৌশলে তাকে ঘরে বন্দি করে রাখে। যৌন কাজ করার জন্য চরম নির্যাতন করতে থাকে। এই বদ্ধ ঘরে এক বছর অতি মানবতের জীবন কাটে আসমার। পরবর্তীতে আসমার বয়স বাড়িয়ে ভূয়া জন্মনিবন্ধ তৈরি করে। সেই জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে লাইসন্সে করে যৌন কাজে বাধ্য করা হয় তাকে। শুরু হয় আসমার ট্র্যাজেডি জীবনের আর এক অধ্যায়।

ফুটফুটে কিশোরী আসমা যেন হাজারো ক্ষুধার্ত বাঘের খাবারে পরিনত হয়। চারদিকে কড়া পাহারায় রেখে জমজমাট ব্যবসা করে যায় সেই সরদারনী। আসমা কৌশলে অনেক চেষ্টা করে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনের গল্প সাজাতে চয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টায় নিয়তির নির্মমতার কাছে হেরে যায়। আর সে হয় একজন কমপ্লিট যৌনর্কমী।

আসমা তার জীবনের নির্মমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় লুটিয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে ভাষার ছন্দ। জীবনের সুন্দর স্বপ্নগুলো শুকিয়ে নিথর পাথর হয়ে যাওয়ায় আজ আর কোন অর্জনই তার অবশষ্টি নেই। ব্যর্থতার কান্নাই যেন তার শেষ পরিচয়।

কিছুদিন পরইে তার কোলে আসে একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। মেয়েটি বড় হতে থাকলে সে সিদ্ধান্ত নেয় মেয়ে যেন তার মতো ডাস্টবিনে পড়ে থাকা শিয়াল কুকুরের খাবারে পরিনত না হয়। তাই মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা তার পিছু ছাড়েনি। মেয়েটিও যৌন পাচারের শিকার হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করে অপরাজয়ে-বাংলাদশে জামালপুর শেল্টার হোমে নিয়ে আসে। শুরু হয় সন্তানের ভবষ্যিত নিয়ে আর এক যুদ্ধ। বর্তমানে সন্তানই তার জীবনের নির্জাস। তার সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করেই সন্তানের পরিচয়ে সে বেঁচে থাকতে চায়। এটাই তার জীবনের শেষ চাওয়া। আসমার শেষ কথা- কোন মেয়ে যেন সোনালী সারথী জীবনকে বীভৎস ধ্বংস স্তূপে পরিনত না করে। কারো স্থান যেন না হয় এই নিষিদ্ধপল্লীতে।

এদিকে ওই অসহায় কন্যাশিশু আসমারসহ এমন অনেক শিশুদের বিষয়ে অপরাজেয় বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে আসে করুণ জীবন কাহিনী। যেসব কারণে ভুল জন্মনিবন্ধনের কারণে নাগরিক অধিকার পেতে এমন অনেক শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দেয়, সেগুলো হলো- জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাচার ও শোষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আইনি সহায়তা ও কেস ম্যানেজমেন্টে জটিলতা তৈরি হয়। বয়সভিত্তিক সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় না। বিশেষত ঈঝঞ – এর শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক জন্মনিবন্ধন না থাকায় পুনরায় শোষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষায় অপরাজেয়-বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সুপারিশ তৈরি করে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহবান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, অপ্রাপ্য শিশুদের সর্বোত্তম সুরক্ষার জন্য ১. জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে শিশুবান্ধব ও সারভাইভার-সেনসিটিভ করতে হবে। ২. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও রেজিস্ট্রারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ৩. অপ্রাপ্য (Oprappo) অপশনের ব্যবহার সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন। ৪. সামাজিক সুরক্ষা, রেফারেল সেবা ও জন্মনিবন্ধনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অপরাজেয় বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে বাস্তব যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো : ১. জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতি রোধে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা। ২. যেকোনো সংশোধনের জন্য বাধ্যতামূলক হলফনামা ও ডকুমেন্টারি যাচাইকরণ। ৩.ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ফি মওকুফ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিতকরণ। ৪. কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ। এবং ৫. সরকার ও এনজিও সমন্বয়ে রেফারেল ও ফলোআপ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা দরকার।

সংস্থাটির মতে, সঠিক জন্মনিবন্ধনই হলো শিশুর পরিচয়, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ভিত্তি। ভুল জন্মনিবন্ধন বন্ধে অবিলম্বে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সময়।