পরিশ্রমে প্রতিনিয়ত ঘাম ঝরলেও জেলেদের জীবনে নেই স্বস্তি। জালেই জড়ানো জেলেদের জীবন। হয়ত মাছের জাল, নয়ত ঋণের জাল। সংসার চালাতে, নৌকা মেরামত কিংবা জাল কিনতে অনেকের জড়িয়ে পড়ে ঋণের জালে। এ এক অন্তহীন কঠিন বাস্তবতা।
জন্মের পর বাবার হাত ধরে মাছ শিকারকে পেশা হিসাবে বেছে নেন জামালপুরের ইসলামপুর ব্রহ্মপুত্র চরের হেলাল শেখ। জীবনযুদ্ধ জয় করেছেন ঠিকই, তবে হার মেনেছেন ভাগ্যের কাছে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই পেশায় থেকে তার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন তো হয়নি, বরং ঋণের জালে বন্দি হয়ে তিনবেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই এখন দায়।
শুধু হেলাল নয় জেলে পল্লীর অধিকাংশ মানুষের জীবনের গল্প এমনই। ঋণে আবদ্ধ জীবন তাদের অনেকটা জালে আটকে পড়া মাছের মতই। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার যমুনা নদীতে রাতে মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুর্গম চরের জেলেরা। যমুনার বুকে শুরু হয় তাদের জীবনযুদ্ধ। রাতভর জাল ফেলে রাখা ধরা মাছ নিয়ে কুয়াশার আবেশ না কাটতেই আবার একে একে ভিড়তে থাকে উপজেলার গুঠাইল ঘাটে। নৌকা থেকে নামানো হয় রাতভর কষ্ট করে ধরা ঝুড়ি ভরা মাছ।

আবার কারও ধরা মাছ এতটাই কম যে তা বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানোই কঠিন। শুরু হয় মাছ বেচাকেনার ব্যস্ততা। ঘাটে জড়ো হন শত শত জেলে, পাইকার ও খুচরা ক্রেতা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠলেও কোলাহলের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে জেলেদের দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার গল্প।
গুঠাইল ঘাটের আড়ৎদার শিপন মিয়া জানান, যমুনায় পানি বাড়লে মাছের সরবরাহ বাড়ে। তখন জেলেদের মুখে ফুটে ওঠে আশার আলো। কিন্তু পানি কমতে শুরু করলেই কমে যায় মাছ। সঙ্গে কমতে থাকে আয়ও। তখন সংসার চালানো, নৌকা মেরামত কিংবা ছিঁড়ে যাওয়া জাল কিনতে অনেককেই ছুটতে হয় আড়ৎদারদের কাছে।
আড়ৎদার রবিউল জানান, বছরের শুরুতে জেলেরা জাল ও নৌকা মেরামতের জন্য কিছু টাকা অগ্রিম নেন। পরে মাছ বিক্রির টাকা থেকে অল্প অল্প করে সেই ঋণ পরিশোধ করেন। ধরা মাছ ন্যায্য দামে বিক্রি করে ঋণের টাকা রেখে বাকি অর্থ জেলেদের দেওয়া হয়।
গুঠাইল ঘাটের জেলে নরেশ চন্দ্র জানান, নদীতে এখন আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। যতটুকু পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই অনেক জেলে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
সাপধরী এলাকার জেলে নহিন্দর বলেন, বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকায় কিছু মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে জেলেদের অলস সময় পার করতে হয়। তখন সংসার চালানোর জন্য মহাজনদের কাছ থেকে দাদন বা ঋণ নিতে হয়। পরে মাছ বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করতে হয়। এভাবেই অভাব-অনটনের মধ্যে চলছে তাদের জীবন।
জেলেরা জানান, গুঠাইল এই ঘাটে এখনও অনেকটাই পুরোনো নিয়মে চলে মাছের বেচাকেনা। আড়ৎদারের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় মাছের দাম। ফলে নিজেদের ধরা মাছের মূল্য নির্ধারণে জেলেদের হাতে অনেক সময় খুব বেশি সুযোগ থাকে না। দিন শেষে মাছ বিক্রি করে হতাশ হয়ে ঘাট ছাড়লেও তাদের চোখে থাকে নতুন দিনের আশার আলো। কারণ যমুনাই তাদের জীবিকা, যমুনাই তাদের স্বপ্ন, নদীই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে যারা মানুষের পাতে মাছ তুলে দেন, তাদের নিজেদের পাতে প্রতিদিন খাবার জোটে কি না, সেই হিসাব হয়ত কেউ রাখে না। মাছের সঙ্গে তারা নদী থেকে তুলে আনেন বেঁচে থাকার স্বপ্নও। কিন্তু মাছের অভাব, সংসারের টানাপোড়েন আর ঋণের বোঝায় সেই স্বপ্ন যেন বারবার ডুবে যায় যমুনার গভীর জলে। তারা বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু চাল দেওয়া হয়। এই চালে জীবন চলে না। তারা তাদের জীবনমান পরিবর্তনে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
ইসলামপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আশিকুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করেছি। অনুদান হিসাবে বিভিন্ন সময় তাদের ছাগল ও বকনা বাছুর দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার সময় চাল সহায়তা দেওয়া হয়।
লিয়াকত হোসাইন লায়ন : নিজস্ব প্রতিবেদক, ইসলামপুর, বাংলারচিঠিডটকম 


















