জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম। চারদিকে ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের ছোটাছুটি, কোলাহল আর জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝেই প্রতিদিন চোখে পড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি ছোট্ট দস্তরখানার ওপর সাজানো মুড়ি, চানাচুর, কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ। সেই দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক অসহায় নারী—রহিমা বেগম। চোখে তার অনন্ত অপেক্ষা, বুকভরা কষ্ট আর মুখে জীবনের কঠিন সংগ্রামের ছাপ।
প্রতিবার ট্রেন থামলে রহিমার চোখ ছুটে যায় যাত্রীদের দিকে। হয়তো এই ট্রেন থেকেই নেমে আসবেন তার হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ বাবা মি. নেওয়াজ। হয়তো দূর থেকে কাঁপা গলায় ডাক দেবেন—“মা রহিমা…”
একসময় এই স্টেশনেই ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ মি. আলী নেওয়াজ। ছোট্ট একটি দস্তরখানা, কয়েকটি কৌটায় মুড়ি, চানাচুর আর মানুষের ভালোবাসাই ছিল তার সম্বল। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও থেমে থাকেননি তিনি। প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে স্টেশনে এসে বসতেন। সারাদিন কষ্ট করে ঝালমুড়ি বিক্রি করেই চলতো তার আর মেয়ের সংসার।
রহিমা বেগমের জীবন আগেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অনেক বছর আগে স্বামী মারা যান। একমাত্র মেয়েকে অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন। এরপর বৃদ্ধ বাবাই ছিলেন তার একমাত্র ভরসা। বাবা-মেয়ের ছোট্ট সংসারে অভাব থাকলেও ছিল গভীর ভালোবাসা।
কিন্তু চলতি রমজান মাসে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবাকে প্রতিদিন রোজা রেখে কষ্ট করে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখে সহ্য করতে পারছিলেন না রহিমা। একদিন বাবাকে তিনি অনুরোধ করেন, “বাবা, আর কষ্ট কইরো না। এই বয়সে এত কষ্ট করা লাগে না।”
মেয়ের সেই কথাতেই হয়তো অভিমান জমে যায় বৃদ্ধ বাবার মনে। পরিবারের লোকজন জানান, ওই ঘটনার পর একদিন চুপচাপ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান মি. নেওয়াজ। তারপর আর ফিরে আসেননি।
তারপর থেকে যেন অন্ধকার নেমে আসে রহিমার জীবনে।
বাবাকে খুঁজতে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, বিভিন্ন এলাকা, স্টেশন, বাজার—কোথাও বাদ রাখেননি তিনি। কিন্তু কোথাও মেলেনি কোনো সন্ধান। প্রতিটি দিন কাটছে আতঙ্ক আর অজানা আশঙ্কায়।
বাবার অনুপস্থিতিতে সংসারের চাকা থেমে যাওয়ার উপক্রম হলে শেষ পর্যন্ত বাবার পুরোনো ঝালমুড়ির দস্তরখানাই কাঁধে তুলে নেন রহিমা। এখন প্রতিদিন জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে বসে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন তিনি। দোকানের প্রতিটি কৌটা, প্রতিটি চামচ, প্রতিটি থালায় যেন বাবার স্মৃতি লেগে আছে।
কাঁদতে কাঁদতে রহিমা বলেন, “বাবা ছাড়া আমার কেউ নাই। আমি শুধু চাইছিলাম এই বয়সে বাবা আর কষ্ট না করুক। কিন্তু বাবা আমার কথায় অভিমান করে চলে গেছে। কত জায়গায় খুঁজছি, কোনো খবর পাই না। এখন বাবার দোকান নিয়েই স্টেশনে দাঁড়াই। মনে হয়, কোনোদিন হয়তো বাবা ফিরে আসবে।”
রহিমার এই অসহায় অবস্থায় মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন জামালপুর রেলওয়ে থানার কর্মকর্তা ইনচার্জ (ওসি) ও স্টেশন মাস্টার। তারা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং রহিমাকে স্টেশনে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে সহায়তা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রেলওয়ে থানার ওসি প্রায়ই রহিমার খোঁজ নেন এবং বৃদ্ধ নেওয়াজের সন্ধান পেতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্টেশন মাস্টারও মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখছেন এবং রহিমাকে সাহস জোগাচ্ছেন।
জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের আরেক ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতা মি. খলিল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “মেয়েটারে দেখলে খুব কষ্ট লাগে। নিজের বাবারে খুঁজতে খুঁজতেই বাবার কাজ করতেছে। প্রতিদিন ট্রেন আইলে মানুষের মুখের দিকে তাকায়। মনে হয় বাবা আইবো।”
স্টেশনের নিয়মিত যাত্রীরাও এখন রহিমাকে চিনে ফেলেছেন। কেউ ঝালমুড়ি কিনে বাড়তি টাকা দিয়ে যান, কেউ সান্ত্বনা দেন, আবার কেউ বৃদ্ধ বাবার খোঁজ জানতে চান। কিন্তু রহিমার চোখে একটাই অপেক্ষা—তার বাবা ফিরে আসবেন।
রেলস্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু রহিমা বেগমের সময় যেন থেমে আছে সেই দিনটিতেই, যেদিন অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছিলেন তার বৃদ্ধ বাবা।
আজও প্রতিটি ট্রেনের শব্দে চমকে ওঠেন তিনি। প্রতিটি বৃদ্ধ মানুষের মুখে খুঁজে ফেরেন বাবাকে। হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ করেই ফিরে আসবেন মি. নেওয়াজ। হয়তো আবার সেই পুরোনো দস্তরখানায় বসে বলবেন—“মা, ঝালমুড়ি বানাইয়া দে।”
আর সেই আশাতেই চোখের জল লুকিয়ে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন রহিমা বেগম। স্থানীয় সচেতন মহল নিখোঁজ বৃদ্ধ মি. নেওয়াজের সন্ধান পেতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন। কারণ একটি মেয়ের কাছে তার বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন—তিনি তার পৃথিবীর শেষ আশ্রয়।
এন এইচ বাবু ঢালী : ফটো সাংবাদিক 


















