শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও ফতেহপুর ফাজিল মাদরাসার আরবি প্রভাষক মাওলানা রেজাউল করিমের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় ইমামতি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সামিউল হক ফারুকী।
জানাজায় হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। শোক, শ্রদ্ধা আর আবেগে পুরো এলাকা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে আগত মুসল্লি, দলীয় নেতা-কর্মী, আলেম-ওলামা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের প্রিয় এই মানুষকে শেষ বিদায় জানাতে এ জানাজায় অংশ নেন।
২৮ জানুয়ারি, বুধবার বিকালে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জানাজার মাঠজুড়ে মানুষের ঢল নামে। সন্ত্রাসীদের হাতে তাদের প্রিয় ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়াকে তারা যেন কোনভাবেই মানতে পারছিলেন না। জানাজায় এসে তাদের প্রিয় ভাইকে হারিয়ে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. ছামিউল হক ফারুকী, ময়মনসিংহ জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য আইনজীবী নাজমুল হক সাঈদী, শেরপুর-১ (সদর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া, শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল, শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান, এনসিপির জেলা সমন্বয়কারী প্রকৌশলী মো. লিখন মিয়া, খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হালিম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ সম্পাদক ইউসুফ ইসলাহীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
জানাজা-পূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বক্তারা মরহুম মাওলানা রেজাউল করিমের দ্বীনি, শিক্ষামূলক ও সামাজিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তারা বলেন, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সংগঠক, আদর্শ শিক্ষক ও নিরহংকারী সমাজসেবক। দাওয়াহ ও সংগঠনের কাজে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বক্তারা আরও বলেন, তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এ সময় বক্তারা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি জানান।
রাত সাড়ে ৮টায় মরহুমের নিজ গ্রাম গোপালখিলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দ্বিতীয় জানাযায়ও গ্রামের বিপুল সংখ্যক মানুষসহ আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা অংশ নেন। জানাজা শেষে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। এ নৃশংস হত্যাকান্ডে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মাওলানা রেজাউল করিমের এ ঘটনাকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসাবে অভিহিত করেছে। তারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।
এদিকে ঘটনার পর থেকে ঝিনাইগাতী ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় মানুষ দ্রুত ঘটনার ন্যায়বিচার এবং স্থায়ী শান্তি কামনা করছেন।
এদিকে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠানের পূর্বে শ্রীবরদী উপজেলা সদরে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের প্রধান নির্বাচনী কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. ছামিউল হক ফারুকী। তিনি অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
শেরপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার দুপুরে জেলা শহরে এক বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা বলেন, বর্তমানে ঝিনাইগাতীসহ জেলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, শেরপুরে একটা ঘটনা ঘটেছে, অত্যন্ত নিন্দনীয়। তার ধারাবাহিকতায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসাবে এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাকি যা সম্ভব সেগুলো নিশ্চিত করা হবে। ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ জানুয়ারি ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ মাঠে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষে গুরুতর আহত মাওলানা রেজাউল করিমকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে মারা যান তিনি।
মুগনিউর রহমান মনি : নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর, বাংলারচিঠিডটকম 



















