জাহাঙ্গীর সেলিম:
কথিত আছে প্রায় পৌনে তিনশ বছর আগে এক ভূমিকম্পে সৃষ্টি হয় বংশাই নদী। আবার নদী গবেষকদের মতে জামালপুর থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হিসেবে বংশাই নদী মধুপুর, ধামরাই, গাজীপুর হয়ে তুরাগ নদীতে মিশে। যার দৈর্ঘ্য ছিলো ২৩৮ কিলোমিটার। জামালপুরের অংশ মরে গেলেও টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলায় বংশাইয়ের অস্থিত্ব এখনো আছে। বংশাই নদী আজ আমার আলোচ্য বিষয় নয়। তবে বংশা খাল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট চলেই আসে।
জানা যায়, মুঘল আমলে বর্তমান জামালপুর শহরের রানীগঞ্জ বাজার সংলগ্ন চাপাতলা ঘাট থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা হিসেবে যাত্রা শুরু হয় বংশাই নদীর। স্রোতস্বিনী বংশাই নদীর স্বচ্ছ জলে নানা সুস্বাদু মাছের অভয়াশ্রম ছিলো। পাল তোলা নৌকার বহর যেতো এই নদী দিয়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্রহ্মপুত্র আর বংশাইয়ের মোহনা পাটসহ পাটজাত তৈরি পণ্য, নানা পণ্যসামগ্রীর বড় বড় বজরা এসে এখানে থামতো। ছোট খাটো বন্দরও গড়ে উঠে এই মোহনায়।
মুঘল ও নবাবী শাসনের পতনের পর বৃটিশ শাসনামলের শুরু থেকেই এ বন্দরটি জমজমাট হয়ে উঠে। ব্যবসায়ী কেন্দ্র হিসেবে বংশাই পাড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। গঞ্জের হাট হিসেবে পরিচিতি পায় জামালপুর। বৃটিশ বণিকদের মনোরঞ্জের জন্য দুই শতাধিক বছর আগে বংশাই নদীর পাড়ে গড়ে উঠে যৌনপল্লী। নাম রাখা হয় রানীগঞ্জ। এ পল্লীতে বিলাসবহুল করে সাজানো হয় রংমহল। দিল্লি, লক্ষ্ণৌ থেকে নর্তকীরা আসতো এই রংমহলে। দেশ, বিদেশের বণিক আর বিনোদনপ্রিয়াসী মানুষ আসতো বংশাই নদীর পাড়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন স্বাধীনতাকামী সংগ্রামীরা বংশাই নদী ব্যবহার করে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।
কালের বিবর্তনে এবং ভোগবাদী মানুষের লালসার শিকার হয়ে জামালপুরের অংশে মরে গেছে বংশাই নদী।
প্রবাদ আছে ‘নদী মরে গেলেও রেখা থেকে যায়’। বংশাই নদী মরে গিয়ে রেখে গেছে ছোট্ট একটি খাল। যার নাম বংশখাল হিসেবে পরিচিত। ভরাট আর দখল হতে হতে এখন তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং তিন মিটার প্রস্থ অবয়ব নিয়ে কালের স্বাক্ষী হয়ে টিকে আছে বংশখালটি। গেটপাড়, মালগুদাম হয়ে শহরের মাঝখান মৃধাপাড়া, মুকুন্দবাড়ি, দয়াময়ী মোড়, মেডিকেল রোড, রানীগঞ্জ বাজার হয়ে চাপাতলা ঘাট দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে মিশেছে।
আমাদের বাসাটি বংশখালের পাড়েই। শৈশবে দেখেছি বর্ষার সময় কলকল করে অবাধে ছোট ছোট ঢেউ তুলে পানি বয়ে যেতো ব্রহ্মপুত্র নদে। বংশখালে পড়ে আমি নিজে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। মাথা ফেটে বংশখালের জল রংক্তে লাল হয়ে উঠছিলো। লুকিয়ে বড়শি দিয়ে বংশখালের মাছ ধরার কারণে বাবা, মায়ের হাতে বকুনি, পিটুনি দুটোই ভোগ করেছি। কোথায় হারিয়ে গেলো ধূসর পানি বয়ে যাওয়া বংশখালের সৌন্দর্য। সব আছে স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে উঠছে এ লেখার শুরুতেই।
গবাখালের পরেই শহরের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই বংশখাল। যা আজ শহরের সবচেয়ে ময়লার বড় ভাগাড় হিসেবে পরিণত হয়েছে। অবাঞ্ছিত নবজাতকের মরদেহ থেকে শুরু করে মেডিকেল, গৃহস্থালী, পলিথিন, প্লাস্টিকসহ সব ধরনের আবর্জনা ফেলা হয় হয় এই বংশখালে। শীর্ণধারার পানির প্রবাহের সাথে দূষিত সকল ধরনের উপাদান গিয়ে পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদে। বংশখালের দুইপাড়ে গড়ে উঠা বাসিন্দাদের মল, মূত্রের ধারা রাখা হয়েছে বংশখালের জলে। ময়লা, আবর্জনার স্তূপে মশা, মাছি থেকে শুরু করে ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের বসত হয়েছে এখন বংশখালে।
বংশখাল পাড়ের বাসিন্দা সংবাদ কর্মী তানিয়া আবেগ আর তীব্র ক্ষোভের ভাষায় উল্লেখ করেন বংশখাল এখন মশা উৎপাদনের কারখানা হয়েছে। দুর্গন্ধে বাসায় থাকা যায় না।
সমাজকর্মী অজয় পাল বলেন, বংশখাল পানি নিষ্কাশনের জন্য সংস্কার করা না হলে আগামী বর্ষায় শহরের জলবদ্ধতা অসহনীয় হয়ে উঠবে।
জামালপুর পৌরসভার মেয়র ছানোয়ার হোসেন আশ্বাস দিয়ে বলেন, বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করবো। গবাখাল পরিষ্কার করে বংশখাল ধরবো ইনশাল্লাহ। তিনি পৌরবাসীকে কোন ধরনের ময়লা বংশখালে না ফেলার জন্য আহ্বান জানান।
জামালপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম আজাদ চেতনাময় শ্লোগান দিয়ে বলেন, ‘আমরাই পারি, আমরাই পারবো, আমার শহর আমিই গড়বো, আমিই হবো সমাধান।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, গ্রিন জামালপুর, ক্লিন জামালপুর গড়ে তুলতে হলে গবাখাল, বংশখালসহ জলাশয়গুলো আবর্জনা পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করতে হবে। জনগণকে নিয়ে আমরা জয়ী হবোই ইনশাল্লাহ।
বংশখাল সুরক্ষিত রাখতে হলে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের সচেতন হতে হবে। পৌরকর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে মোড়ে মোড়ে ডাস্টবিন স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে এনজিও নিয়োগ দিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে পৌরসভার স্থাপিত ভাগাড়ে ফেলতে হবে। আবর্জনা রিসাইক্লিন করে নানা পণ্যসামগ্রী তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে।
২০০৭ সালে আমাদের সম্মিলিত আওয়াজে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বংশখাল দখলমুক্ত করে তলদেশ আরসিসি ঢালাই করে দুইপাড়ে পাকা রেলিং তৈরি করায় নতুন করে কেউ আর দখল করার সুযোগ পায় নাই। তবে পুরোনো অভ্যাসে ময়লা ফেলতে কার্পণ্য করে না। এতে করে শহরের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপশি বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেখক: সভাপতি, জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, এনজিও এবং গণমাধ্যম কর্মী।
বাংলার চিঠি ডেস্ক : 















