প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে ৩০ অক্টোবর, শুক্রবার জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে প্রায় ২০০টি দেশ দীর্ঘ আলোচনার পর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে প্রকৃতির ওপর মানবজাতির ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় সম্মেলনের ফলাফল নিয়ে হতাশাও দেখা দিয়েছে।
ইয়েরেভান থেকে এএফপি জানায়, শুক্রবার নির্ধারিত সময়ের পর গুরুত্বপূর্ণ দুটি নথি অনুমোদিত হলে প্রতিনিধিরা উল্লাস প্রকাশ করেন। তবে এ উদযাপনের মধ্যেও তিক্ত বিতর্ক এবং কয়েকটি বিতর্কিত বিষয়ে সীমিত অগ্রগতির জন্য অনুশোচনা ছিল।
আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিত কপ-১৭ সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির ধ্বংস বন্ধ ও পুনরুদ্ধারে ২০৩০ সালের মধ্যে অগ্রগতি নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক অঙ্গীকারকে নতুন করে গতিশীল করা। বৈশ্বিক প্রচেষ্টা এ লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে পড়ার পর সম্মেলনটি এ উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে।
ইয়েরেভানে টানা দুই সপ্তাহের কঠিন আলোচনায় দেশগুলোকে প্রকৃতির সুরক্ষায় বৈশ্বিক চুক্তি কার্যকর রাখতে এবং পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা উদ্ভিদ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছিল, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। এ লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর স্থলভাগ ও সমুদ্রের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ, দূষণ ও আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার মোকাবিলা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে অর্থায়ন বাড়ানো।
আর্মেনিয়ায় সম্মেলনের সভাপতি হাম্বারৎসুম মাতেভোসিয়ান দুটি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে হাতুড়ি ঠুকে অনুমোদন ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই। একদম ঠিক।’ তবে শনিবার ভোরেও নথি দুটির চূড়ান্ত সংস্করণ পাওয়া যায়নি।
সম্মেলন শেষ হওয়ার প্রাক্কালে শনিবার ভোরে ফ্রান্সের পরিবেশগত রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী মনিক বারবু বলেন, প্রাপ্ত ফলাফল প্রাকৃতিক জগৎকে ঘিরে থাকা সংকটের তুলনায় ‘যথেষ্ট নয়’।
এএফপিকে পাঠানো এক দীর্ঘ বিবৃতিতে বারবু বলেন, ‘এখানে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছি, তা জীববৈচিত্র্য হ্রাস মোকাবিলায় আমাদের পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করার একের পর এক হাতছাড়া সুযোগ।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের আলোচনার গতির জন্য প্রকৃতি অপেক্ষা করবে না।’
‘অগ্রগতির একটি ধাপ’
শুক্রবার রাত পেরিয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত সম্মেলনের সমাপনী পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন চলে। সময় যত গড়িয়েছে, আলোচনা ততই তিক্ত হয়ে উঠেছে।
কয়েকজন প্রতিনিধি ফ্লাইট ধরতে সম্মেলনস্থল ছেড়ে গেলেও অন্যরা কারিগরি বিষয় নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে যান।
আইডিডিআরআই থিংকট্যাংকের অভিজ্ঞ কপ পর্যবেক্ষক জুলিয়েট ল্যান্ড্রি এএফপিকে বলেন, পুরো সম্মেলনজুড়ে ‘সব দিক থেকে টানাপোড়েন ছিল’ এবং ‘এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন’।
বহুল আলোচিত একটি নথির খসড়া চুক্তিতে দেশগুলোকে তাদের প্রচেষ্টা ‘ত্বরান্বিত’ করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের জন্য দায়ী কারণগুলো মোকাবিলায় ‘আরও জোরালো পদক্ষেপের’ প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
ডব্লিউডব্লিউএফ ইন্টারন্যাশনালের গুইদো ব্রুকহোভেন এএফপিকে বলেন, ‘এটি ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিছু দুর্বলতা থাকলেও, বিশেষ করে ক্ষতিকর ভর্তুকির বিষয়ে, এটি অগ্রগতির একটি ধাপ।’
প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জোগানো ভর্তুকি ও অন্যান্য প্রণোদনা বন্ধ করা ছিল সম্মেলনের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, নিবিড় কৃষি এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণ।
গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের আন ল্যামব্রেখটস এএফপিকে বলেন, ‘সম্মত সিদ্ধান্তের ভাষা দুর্বল হলেও ক্ষতিকর আর্থিক প্রণোদনা, বিশেষ করে ভর্তুকি মোকাবিলায় কপ-১৭-এ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে।’
বিজ্ঞানের বিষয়ে বিরল এক বিরোধ সম্মেলনের পরিবেশকে ম্লান করে দেয়। কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুমোদনের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিজ্ঞ আলোচকরাও বিস্মিত হন।
কয়েক ডজন দেশের পক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে সুইজারল্যান্ডের আলোচক গ্যাব্রিয়েলা ব্ল্যাটার বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং নীতিনির্ধারণে এর ব্যবহার রাজনৈতিক কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করার ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিদলগুলো প্রতিটি রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার অধিকারকে পূর্ণ সম্মান জানায়। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না।’
অর্থায়ন নিয়ে মতবিরোধ
প্রকৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য নতুন উৎস খুঁজে বের করা নিয়েও পৃথক বিরোধ দেখা দেয়। জ্বালানি সংকট এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরকারি বাজেটে চাপ থাকায় বিষয়টি সম্মেলনে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনসহ তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে বৈশ্বিক প্রকৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগে অর্থায়নের আহ্বান জানায়। কপ-১৭ সম্মেলনে এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়।
সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবে শুক্রবার প্রচারিত আরেকটি খসড়া নথিতে উন্নত দেশগুলোর দাতা গোষ্ঠীর বাইরে থাকা দেশগুলোকে স্বেচ্ছায় এ গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কয়েক বিলিয়ন ডলারের করপোরেট অনুদান সংগ্রহের প্রত্যাশায় জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত ‘ক্যালি ফান্ড’-এর কাঠামো নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোরও নিষ্পত্তি হয়নি। তহবিলটিতে বর্তমানে অর্থের পরিমাণ প্রায় শূন্য।
‘প্ল্যান্ট-ফর-দ্য-প্ল্যানেট’ নামের অলাভজনক সংস্থার পাখি দাস বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দুই বছর পরের জন্য ঠেলে দিয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো কার্যত নিশ্চিত করেছে যে, ততদিন পর্যন্ত তহবিলটি শূন্যই থাকবে।’
সম্মেলনে শনিবার ভোরে সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৮ সালে পরবর্তী জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক হবে ইকুয়েডর। গোপন ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী পানামাকে পরাজিত করে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি এ দায়িত্ব পায়। সূত্র : বাসস
বাংলারচিঠিডটকম ডেস্ক 


















