ঢাকা ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে : ইকবাল হাসান মাহমুদ অনিরাপদ খাদ্যের স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত বিজিবির অভিযানে ভারতীয় কসমেটিক পণ্য উদ্ধার ইসলামপুরে বৃদ্ধ দম্পত্তি চায় নিরাপদ ঘর, দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা ইসলামপুরে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে দু’জনের মৃত্যু হিউম্যান রাইটস ভয়েস বাংলাদেশের বকশীগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক হলেন সাঈদ ঝর্নায় জ্বালানি তেল না আসায় ভোগান্তিতে ইসলামপুরবাসী আওনা ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বারদের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত সৌদি আরবে বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু, মদিনায় দাফন

ঈদ লেগেছে শেরপুরের কামার পাড়ায়

কাজে ব্যস্ত এক কামার শিল্পী। ছবি: বাংলারচিঠিডটকম

কাজে ব্যস্ত এক কামার শিল্পী। ছবি: বাংলারচিঠিডটকম

সুজন সেন, নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর, বাংলারচিঠিডটকম: আসছে কোরবানি। কোরবানি শব্দটি আরবি (কুরব) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করাই কোরবানি। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার নামে পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট কিছু হালাল পশু জবাই বা কোরবানি করা হয়।

আর এই ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কামার শিল্পীরা। টুংটাং শব্দই বলছে ঈদ লেগেছে কামার পাড়ায়। দিন রাত চলছে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি ও শানের কাজ। নাওয়া খাওয়া ভুলে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।

শেরপুর জেলার পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন বাজার বা কামাড় পাড়া ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যন্ত জনপদের কামাররা এখন মহাব্যস্ত সময় পার করছেন। লাল আগুনের লোহায় কামারদের পিটাপিটিতে মুখর হয়ে উঠেছে কামার দোকানগুলো। টুংটাং শব্দটি এখন তাদের জন্য এক প্রকার ছন্দ।

জানা যায়, শেরপুর শহরের বিভিন্ন দোকান থেকে লোহা কিনে সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে দা, বটি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করছেন কামাররা। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের দুর্দিন চললেও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমে উঠে তাদের এই হস্তশিল্প।

শ্রীবরদীর ভায়াডাঙা এলাকার কামার শিল্পী দিলীপ বলেন, সারা বছর এই কোরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষায় থাকি। এ সময়টিতে যারা কোরবানির পশু জবাই করেন তারা প্রত্যেকে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি করেন। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ সময়টিতে কাজ বেশি হওয়ার কারণে লাভও বেশি হয়। তবে লোহা আর কয়লার দাম বেশি থাকায় মজুরিও একটু বেশি নিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের পরিচিত কিছু গ্রাহক দা, বটি, ছুরি বানানোর অর্ডার দিয়ে গেছে এবং শান দেওয়ার অর্ডার পেয়েছি। পাশাপাশি নতুন বটি, ছুরি তৈরি করছি। বিশেষ করে কোরবানির ৩-৪ দিন আগে গ্রাহকের আনাগোনা আরও বেড়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

কেনা-বেচায় ব্যস্ততা। ছবি: বাংলারচিঠিডটকম

ঝিনাইগাতীর সদর বাজারের কামার শিল্পী রতন মিয়া, আবু মিয়া ও জাকারিয়া জানান, এক সময় তাদের বেশ কদর ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। তাই সারা বছর তেমন কোন কাজ থাকেনা। তবে ধান কাটার মৌসুম ও কোরবানি উপলক্ষে তাদের কাজের চাহিদা বেড়ে যায়। এসময় তাদের দৈনিক ১০০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হলেও, ব্যয় বাদে তাদের হাতে থাকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

তারা আরও বলেন, বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতেই মূলত কিছু কামার এখনো এ পেশায় জড়িয়ে আছেন। এছাড়া পরিশ্রমের তুলনায় এ পেশায় সাধারণত আয় ও সম্মান উভয়ই কম। তাই অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

তারা এ পেশার ভবিষ্যত নিয়েও এখন চিন্তিত, কারণ এ কাজের সময় আওয়াজ হয় বলে শহরে তেমন কেউ তাদের দোকান ভাড়া দিতে চায় না। আগামীতে এ পেশা টিকিয়ে রাখা খুব কষ্ট হয়ে পড়বে বলেও তারা মত প্রকাশ করেন।

কামারি হাজী ইয়াসন জানায়, এই এক মাসের কাজের উপর তাদের পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া জামা-কাপড় সহ বছরের খোরাকী নির্ভর করে। যদিও কামার শিল্পের আনুসাঙ্গিক কয়লা ও লোহার দাম লাগামহীনভাবে উঠানামা করতে থাকে। তাই কামাররা বাপ-দাদার এ পেশাকে ধরে রাখতে কয়লা ও লোহার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

ক্রেতা নিজাম মিয়া ও ফয়জুল্লা বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার লোহার দাম অনেক বেশি হওয়ায় লোহার তৈরি জিনিসের দামও অনেক বেড়েছে। দা ২৫০-৩৫০ টাকা, ছুরি ১৫০-৪০০ টাকা, বটি ৩০০-৫০০ টাকা, চাপাতি ১,০০০-১৫০০ টাকা করে বেচা-কেনা হচ্ছে।

ক্রেতা ইউসুফ বলেন, কামাররা দেশিয় প্রযুক্তিতে লোহা আগুনে গরম করে পিটিয়ে দা, ছুরি তৈরি করেন। এখানে নিজেদের সুবিধা মত ওইসব জিনিস তৈরি করা যায়। সেগুলো খুব টেকসই হয়।

নকলা শহরের যাত্রী ছাউনির পিছনের লোহার তৈজসপত্র তৈরির কারিগর মঞ্জু মিয়া বলেন, গ্রাহকের অর্ডার সামাল দিতে ইতিমধ্যে দোকানে বাড়তি কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছি। প্রতি কেজি ৮৫ টাকা দরে দুই মণ কাঁচা লোহা কিনে এনেছি।

মঞ্জু মিয়া আরও বলেন, আগে নকলা শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাচারী মসজিদ মোড় থেকে পূর্বদিকে যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু কামারের দোকান ছিল। আর তাদের অবস্থানগত পরিচিতির জন্যই নকলা শহরের জনবহুল ও গুরুত্বপূূর্ণ ওই এলাকার নামকরন করা হয়েছিল কামারপট্টি।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী

ঈদ লেগেছে শেরপুরের কামার পাড়ায়

আপডেট সময় ০৮:২২:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জুন ২০২৩
কাজে ব্যস্ত এক কামার শিল্পী। ছবি: বাংলারচিঠিডটকম

সুজন সেন, নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর, বাংলারচিঠিডটকম: আসছে কোরবানি। কোরবানি শব্দটি আরবি (কুরব) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করাই কোরবানি। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার নামে পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট কিছু হালাল পশু জবাই বা কোরবানি করা হয়।

আর এই ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কামার শিল্পীরা। টুংটাং শব্দই বলছে ঈদ লেগেছে কামার পাড়ায়। দিন রাত চলছে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি ও শানের কাজ। নাওয়া খাওয়া ভুলে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।

শেরপুর জেলার পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন বাজার বা কামাড় পাড়া ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যন্ত জনপদের কামাররা এখন মহাব্যস্ত সময় পার করছেন। লাল আগুনের লোহায় কামারদের পিটাপিটিতে মুখর হয়ে উঠেছে কামার দোকানগুলো। টুংটাং শব্দটি এখন তাদের জন্য এক প্রকার ছন্দ।

জানা যায়, শেরপুর শহরের বিভিন্ন দোকান থেকে লোহা কিনে সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে দা, বটি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করছেন কামাররা। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের দুর্দিন চললেও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমে উঠে তাদের এই হস্তশিল্প।

শ্রীবরদীর ভায়াডাঙা এলাকার কামার শিল্পী দিলীপ বলেন, সারা বছর এই কোরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষায় থাকি। এ সময়টিতে যারা কোরবানির পশু জবাই করেন তারা প্রত্যেকে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি করেন। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ সময়টিতে কাজ বেশি হওয়ার কারণে লাভও বেশি হয়। তবে লোহা আর কয়লার দাম বেশি থাকায় মজুরিও একটু বেশি নিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের পরিচিত কিছু গ্রাহক দা, বটি, ছুরি বানানোর অর্ডার দিয়ে গেছে এবং শান দেওয়ার অর্ডার পেয়েছি। পাশাপাশি নতুন বটি, ছুরি তৈরি করছি। বিশেষ করে কোরবানির ৩-৪ দিন আগে গ্রাহকের আনাগোনা আরও বেড়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

কেনা-বেচায় ব্যস্ততা। ছবি: বাংলারচিঠিডটকম

ঝিনাইগাতীর সদর বাজারের কামার শিল্পী রতন মিয়া, আবু মিয়া ও জাকারিয়া জানান, এক সময় তাদের বেশ কদর ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। তাই সারা বছর তেমন কোন কাজ থাকেনা। তবে ধান কাটার মৌসুম ও কোরবানি উপলক্ষে তাদের কাজের চাহিদা বেড়ে যায়। এসময় তাদের দৈনিক ১০০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হলেও, ব্যয় বাদে তাদের হাতে থাকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

তারা আরও বলেন, বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতেই মূলত কিছু কামার এখনো এ পেশায় জড়িয়ে আছেন। এছাড়া পরিশ্রমের তুলনায় এ পেশায় সাধারণত আয় ও সম্মান উভয়ই কম। তাই অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

তারা এ পেশার ভবিষ্যত নিয়েও এখন চিন্তিত, কারণ এ কাজের সময় আওয়াজ হয় বলে শহরে তেমন কেউ তাদের দোকান ভাড়া দিতে চায় না। আগামীতে এ পেশা টিকিয়ে রাখা খুব কষ্ট হয়ে পড়বে বলেও তারা মত প্রকাশ করেন।

কামারি হাজী ইয়াসন জানায়, এই এক মাসের কাজের উপর তাদের পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া জামা-কাপড় সহ বছরের খোরাকী নির্ভর করে। যদিও কামার শিল্পের আনুসাঙ্গিক কয়লা ও লোহার দাম লাগামহীনভাবে উঠানামা করতে থাকে। তাই কামাররা বাপ-দাদার এ পেশাকে ধরে রাখতে কয়লা ও লোহার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

ক্রেতা নিজাম মিয়া ও ফয়জুল্লা বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার লোহার দাম অনেক বেশি হওয়ায় লোহার তৈরি জিনিসের দামও অনেক বেড়েছে। দা ২৫০-৩৫০ টাকা, ছুরি ১৫০-৪০০ টাকা, বটি ৩০০-৫০০ টাকা, চাপাতি ১,০০০-১৫০০ টাকা করে বেচা-কেনা হচ্ছে।

ক্রেতা ইউসুফ বলেন, কামাররা দেশিয় প্রযুক্তিতে লোহা আগুনে গরম করে পিটিয়ে দা, ছুরি তৈরি করেন। এখানে নিজেদের সুবিধা মত ওইসব জিনিস তৈরি করা যায়। সেগুলো খুব টেকসই হয়।

নকলা শহরের যাত্রী ছাউনির পিছনের লোহার তৈজসপত্র তৈরির কারিগর মঞ্জু মিয়া বলেন, গ্রাহকের অর্ডার সামাল দিতে ইতিমধ্যে দোকানে বাড়তি কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছি। প্রতি কেজি ৮৫ টাকা দরে দুই মণ কাঁচা লোহা কিনে এনেছি।

মঞ্জু মিয়া আরও বলেন, আগে নকলা শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাচারী মসজিদ মোড় থেকে পূর্বদিকে যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু কামারের দোকান ছিল। আর তাদের অবস্থানগত পরিচিতির জন্যই নকলা শহরের জনবহুল ও গুরুত্বপূূর্ণ ওই এলাকার নামকরন করা হয়েছিল কামারপট্টি।