ঢাকা ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে সরকার : তথ্য প্রতিমন্ত্রী লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ৬ অক্টোবর সরিষাবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজিম উদ্দিনের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত যানবাহন চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জামালপুরে বিআরটিএ’র প্রশিক্ষণ কর্মশালা সরিষাবাড়ীতে অনলাইন জুয়ার ‘সম্রাট’ সবুজ গ্রেপ্তার দুর্গাপূজা : মাদারগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত নকলায় পূজা মণ্ডপে জিআর চাল বিতরণ করলেন এমপি ডেঙ্গু প্রতিরোধে নকলায় মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শেরপুরে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ছাত্রদল নেতার উপর হামলা : বিচার দাবি

স্বামীকে হারিয়ে সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে শহীদ মিজানুরের স্ত্রী

মাদারগঞ্জ : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মিজানুর রহমান। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম শহীদ মো. মিজানুর রহমানের। জীবিকার সন্ধানে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই রাজধানীতে পাড়ি জমান তিনি। পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন আশুলিয়ার বাইপাইলের একটি গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে। দীর্ঘদিন পোশাক শ্রমিকের কাজের পর তিনি ফুটপাতে জুতা ব্যবসা শুরু করেন।

ব্যবসা করে ভালোই চলছিল মিজানুরের সংসার। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে সিঙ্গাপুর পাঠাবেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে মিজানুরের পরিবারের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দুই সন্তানের বাবা ৩৭ বছর বয়সি এই যুবক। বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর ছেলে শুভ (১৪) ও মেয়ে মিমি (৭)। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন স্ত্রী শেফালী বেগম।

শহীদ মো. মিজানুর রহমানের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের ভেলামারী গুচ্ছগ্রামে। জায়গা-জমি না থাকায় মিজানুরের বাবা ওসমান গণি আশ্রয় নেন গুচ্ছগ্রামে। অতিদরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠা মিজানুর রহমান পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ২২ বছর আগে ঢাকায় পাড়ি জমান। এরপর তিনি শেফালী বেগমকে বিয়ে করেন। অর্থ সংকট কাটাতে তার স্ত্রী চার বছর আগে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মিজানুরের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে শুভ আশুলিয়ার বাইপাইলের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি ও মেয়ে মিমি একটি মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। মিজানুরের উপর নির্ভরশীল ছিল অসুস্থ বাবা ওসমান গণি এবং বৃদ্ধা নানি এজি বেগম।

জানা গেছে, আশুলিয়া থানার পাশেই একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন মিজানুর ও তার পরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার বিকালে আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ হয়। সেদিন ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। মানুষের চিৎকার, চেঁচামেচি, গোলাগুলির শব্দ শুনে মিজানুরের ছেলে শুভ বাসার ছাদে যায়। ছেলেকে বাসার ছাদ থেকে নামিয়ে আনতে যান মিজানুর। ছেলেকে নিয়ে ছাদ থেকে নামার সময় হঠাৎ পুলিশের ছোঁড়া একটি গুলি এসে লাগে মিজানুরের তলপেটে। মুহূর্তেই ছাদের উপর লুটিয়ে পড়েন তিনি।

পরে আশপাশের লোকজন ধরাধরি করে মিজানুরকে বাড়ির নিচে নিয়ে আসেন। কিন্তু কোনে গাড়ি না পাওয়ায় সন্ধ্যার দিকে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। প্রথমে স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলেও তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর মিজানুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেদিন রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। পরদিন ৬ আগস্ট, মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সদস্যরা মিজানুরের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় গত বছর ঢাকার একটি আদালতে শহীদ মিজানুর রহমানের স্ত্রী শেফালী বেগম বাদী হয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

অশ্রæসিক্ত চোখে মিজানুরের ছেলে শুভ বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার বাবা আর নেই। বাবার স্মৃতি বারবার চোখে ভাসে। বাবা কথা মনে হলে চোখের পানি থামাতে পারি না। মন চাচ্ছে বাবাকে বুকে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে রাখি। যারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই।

স্ত্রী শেফালী বেগম বলেন, স্বৈরাচারের একটি বুলেটে এতিম হয়ে গেছে আমার সন্তানেরা। আমার সাজানো সংসারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। তাকে হারিয়ে এখন দুই সন্তান নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি। সংসারের অবস্থা খুবই করুণ। বাইপাইলে একটি গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে কোন রকম ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেঁচে আছি। সরকারের কাছে আবেদন, যারা আমার স্বামীকে গুলি করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বপ্রথম দুই লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে চার লাখ টাকা দিয়েছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালভাবে যেন বেঁচে থাকতে পারি, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই। সরকার যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে ছেলে-মেয়ের সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ করে দিতে পারব।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

স্বামীকে হারিয়ে সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে শহীদ মিজানুরের স্ত্রী

আপডেট সময় ০২:৪৪:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫

অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম শহীদ মো. মিজানুর রহমানের। জীবিকার সন্ধানে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই রাজধানীতে পাড়ি জমান তিনি। পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন আশুলিয়ার বাইপাইলের একটি গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে। দীর্ঘদিন পোশাক শ্রমিকের কাজের পর তিনি ফুটপাতে জুতা ব্যবসা শুরু করেন।

ব্যবসা করে ভালোই চলছিল মিজানুরের সংসার। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে সিঙ্গাপুর পাঠাবেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে মিজানুরের পরিবারের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দুই সন্তানের বাবা ৩৭ বছর বয়সি এই যুবক। বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর ছেলে শুভ (১৪) ও মেয়ে মিমি (৭)। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন স্ত্রী শেফালী বেগম।

শহীদ মো. মিজানুর রহমানের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের ভেলামারী গুচ্ছগ্রামে। জায়গা-জমি না থাকায় মিজানুরের বাবা ওসমান গণি আশ্রয় নেন গুচ্ছগ্রামে। অতিদরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠা মিজানুর রহমান পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ২২ বছর আগে ঢাকায় পাড়ি জমান। এরপর তিনি শেফালী বেগমকে বিয়ে করেন। অর্থ সংকট কাটাতে তার স্ত্রী চার বছর আগে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মিজানুরের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে শুভ আশুলিয়ার বাইপাইলের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি ও মেয়ে মিমি একটি মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। মিজানুরের উপর নির্ভরশীল ছিল অসুস্থ বাবা ওসমান গণি এবং বৃদ্ধা নানি এজি বেগম।

জানা গেছে, আশুলিয়া থানার পাশেই একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন মিজানুর ও তার পরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার বিকালে আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ হয়। সেদিন ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। মানুষের চিৎকার, চেঁচামেচি, গোলাগুলির শব্দ শুনে মিজানুরের ছেলে শুভ বাসার ছাদে যায়। ছেলেকে বাসার ছাদ থেকে নামিয়ে আনতে যান মিজানুর। ছেলেকে নিয়ে ছাদ থেকে নামার সময় হঠাৎ পুলিশের ছোঁড়া একটি গুলি এসে লাগে মিজানুরের তলপেটে। মুহূর্তেই ছাদের উপর লুটিয়ে পড়েন তিনি।

পরে আশপাশের লোকজন ধরাধরি করে মিজানুরকে বাড়ির নিচে নিয়ে আসেন। কিন্তু কোনে গাড়ি না পাওয়ায় সন্ধ্যার দিকে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। প্রথমে স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলেও তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর মিজানুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেদিন রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। পরদিন ৬ আগস্ট, মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সদস্যরা মিজানুরের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় গত বছর ঢাকার একটি আদালতে শহীদ মিজানুর রহমানের স্ত্রী শেফালী বেগম বাদী হয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

অশ্রæসিক্ত চোখে মিজানুরের ছেলে শুভ বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার বাবা আর নেই। বাবার স্মৃতি বারবার চোখে ভাসে। বাবা কথা মনে হলে চোখের পানি থামাতে পারি না। মন চাচ্ছে বাবাকে বুকে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে রাখি। যারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই।

স্ত্রী শেফালী বেগম বলেন, স্বৈরাচারের একটি বুলেটে এতিম হয়ে গেছে আমার সন্তানেরা। আমার সাজানো সংসারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। তাকে হারিয়ে এখন দুই সন্তান নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি। সংসারের অবস্থা খুবই করুণ। বাইপাইলে একটি গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে কোন রকম ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেঁচে আছি। সরকারের কাছে আবেদন, যারা আমার স্বামীকে গুলি করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বপ্রথম দুই লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে চার লাখ টাকা দিয়েছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালভাবে যেন বেঁচে থাকতে পারি, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই। সরকার যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে ছেলে-মেয়ের সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ করে দিতে পারব।