জলজটে নাকাল জামালপুর নগরবাসী : পৌরসভাসহ আমাদের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা

জামালপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির সামনে জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম
জামালপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির সামনে জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম

আমাদের প্রাণের শহর জামালপুর আজ বানের জলের মতো পানিতে ভাসছে। গ্রীষ্মকালে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতেই গোটা শহর বর্ষার বিলের মতো পানিতে থই থই করছে। দৃশ্যটা অপরুপ হলেও নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ নগরবাসী। প্রতিটি বাড়ি ঘরেই পানি। আমাদের মেয়র সাহেব, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবও আক্রান্ত হয়ে পড়েছে জলজটে।

পানি বেরোনোর জায়গা নেই। খাল, বিল, নদী, নালা, পুকুরসহ জলাধারগুলো দিনকে দিন আমরা রাক্ষসের মতো গিলে খেয়েছি এবং খাচ্ছি। বংশখাল এবং শহরের ড্রেনগুলোকে বানিয়েছি ডাস্টবিনে। অপরিকল্পিত বাড়ি নির্মাণ এবং নিজের সামান্য স্বার্থান্ধতার কারণে জনদুর্ভোগ আজ চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।

আমরা আলীসান বাড়ি বানিয়ে পয়ঃনিষ্কাসনের সহজ ব্যবস্থা হিসেবে লেট্রিনের সংযোগ করে দেই বংশখাল অথবা পৌরসভার ড্রেনের সাথে।মলমুত্রসহ অবাঞ্ছিত আবর্জনা গিয়ে পড়ছে একসময়ে জীবনের মতো সুন্দর ব্রহ্মপুত্র নদে।

এতে একদিকে পানি দূষণের ফলে জলজীব ধংস হচ্ছে পাশাপাশি রোগজীবানু ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে বাতাসে। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ।

শেখেরভিটা এলাকায় মাটি ভরাট করে উজানের পানি নামার একমাত্র গতিপথ বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম
শেখেরভিটা এলাকায় মাটি ভরাট করে উজানের পানি নামার একমাত্র গতিপথ বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম

আজ ৪ মে সকাল ১১টায় বৃষ্টি থামার পর ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি ধূসর জলে ভেসে গেছে আমার উঠোন। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। জামালপুরের সবচেয়ে উঁচু জাযগা দয়াময়ী এলাকা স্থানই যদি প্লাবিত হয় তাহলে সারা শহরের কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। জামালপুর শহর থেকে তিরুথা যাওয়ার পথে আমার মটর বাইক এবং গায়ের কাপড় ভিজে জবুথবু হয়ে গেলাম।

বিকেলে বের হলাম শহরের অবস্থা দর্শনে। পাঁচরাস্তা মোড় থেকে শহীদ হারুন সড়ক, ইকবালপুর, সর্দারপাড়া, কাছারিপাড়া, ফকিরপাড়া, স্টেশনবাজার রোড, মালগুদাম রোড, গেইটপাড়, বন্দেরবাড়ি, মেডিকেল রোড়, মুকুন্দবাড়ি, পালপাড়াসহ সর্বত্র জলাবদ্ধতা। বাড়িতে বাড়িতে পানি।

জামালপুর পৌরসভাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম একটি ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। দেড়শ বছর বয়সী এই পৌরসভার বাসিন্দারা শুধু হায় হায় করেই গেলো। চেয়ারম্যান থেকে মেয়র পদন্নোয়ন হলেও পৌরবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন বা সুযোগ সুবিধা যৎসামান্যই হয়েছে। যদিও বর্তমান বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বহুমাত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসিনতা দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত শীত মৌসুমে দুই একটি অলিগলির সড়ক সংস্কার ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়েছে এটা বলা মুস্কিল। যদিও মেয়র সাহেব গর্বের সাথেই বলেছেন এইবারের মতো উন্নয়ন কাজ পৌরসভার ইতিহাসে হয়নি। এ নিয়ে আমি বিস্তারিত বলতে চাই না। সবই দেখছেন পৌরবাসী।

আবর্জনার স্তুপে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধংস করা হয়েছে। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম
আবর্জনার স্তুপে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধংস করা হয়েছে। ছবি : বাংলারচিঠি ডটকম

জামালপুর শহরে জলাবদ্ধতার জন্য শুধুমাত্র পৌরসভায় দায়ী নন। নাগরিকরাও দায় এড়াতে পারেন না। কিছু চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ আছে যারা অন্যের সুবিধার কথা চিন্তা করাতো দূরের কথা নিজের সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের কথা ভাবতেও ভুলে যান। জামালপুর পৌরসভার শেখেরভিটা এলাকার জনৈক ভূমি মালিক উত্তরের পানি প্রবাহের গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছেন। দেউরপাড় চন্দ্রা এলাকাতেও পানি চলাচলের একমাত্র ধারা বাঁধ দিয়ে আটকে ফেলেছে। শহর থেকে পানি মুক্ত হবার অন্যতম মুখ গবাখালি খালের উৎস্যস্থল বন্ধ করে দিয়েছে তথাকথিত প্রভাবশালী মহল। এভাবে জামালপুর শহরের অর্ধশতাধীক পানি চলাচলের গতিপথ রুদ্ধ করা হয়েছে।

জামালপুর শহরের অসংখ্য পুকুর ভরাট করে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মান করা হয়েছে। সিংরাবিল, পাগলাবিল, বেরবেরাবিল এখন ভরাট। ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে পলিথিনসহ গৃহস্থালি ও কারখানা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানের আবর্জনায়। নির্মান সামগ্রী মূল রাস্তা রেখে পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্থ করা হচ্ছে। এতো বাধাবিঘ্ন ভেদ করে বৃষ্টির পানি বের হবে কেমনে?

এ বিষয়ে দেখার যেনো কেউ নেই। জেলা শহরের এই নাকাল অবস্থায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদ্বয়, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পুলিশ সুপার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ আপামর জনসাধারণ শুধু প্রকাশ্যে, নিরবে দোষারুপ করছেন পৌর মেয়রসহ তার পরিষদকে। সমন্বয়হীনতা যাকে বলে। এই বিভাগগুলো একত্রে বসে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আসছে বর্ষাকাল এর আগেই দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ চরম পর্যায়ে চলে যাবে।

জাহাঙ্গীর সেলিম
সম্পাদক