
সুজন সেন, নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর
বাংলারচিঠিডটকম
আনারকলি মাহবুব। তিনি শেরপুর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। মহামারী করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তা। জেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে সমন্বয় রেখে মনিটরিং করছেন সার্বিক কার্যক্রম। সেই সাথে প্রতিপালন করছেন সরকারের যাবতীয় দিক নির্দেশনা।
সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন জেলার পাঁচ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে। প্রয়োজনে স্বশরীরে হাজির হয়ে দেখভাল করছেন প্রশাসনিক সকল কাজ। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের নানা কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করে জেলার বিশিষ্টজনরা বলেছেন, কাজের গতিশীলতা ধরে রাখতে ওয়ার্ড ও গ্রাম পর্যায়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা দরকার। এবং এর সুষ্ঠ তদারকি করতে পারলে এর সুফল ভোগ করতে পারবে সবাই।
জেলা প্রশাসক সঠিক পথেই আছেন উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক জেলা কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, করোনা মোকাবেলা করা প্রশাসনের একার পক্ষে সম্ভবনা। এর জন্য সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সকলকে অনুধাবন করতে হবে সরকারের নির্দেশনা পালন করলে জীবন ও জীবিকা দুটোই বাঁচবে।
সরকারের প্রতিটি দিক নির্দেশনা তিনি (জেলা প্রশাসক) মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছেন। আইন মেনে চলতে তিনি যেমন কঠোর হচ্ছেন। অন্যদিকে পরম মমতায় হতদরিদ্র, ভিক্ষুক ও কর্মহীনদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী। এছাড়া কৃষকের চলতি বোরো ধান সময় মতো ঘরে তুলতে নিয়েছেন সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
হিরু বলেন, জেলায় বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী আছেন। যারা ইচ্ছা করলে আগামী এক বছর শেরপুরের হতদরিদ্র, ভিক্ষুক ও কর্মহীনদের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন। এ দুর্যোগে তিনি ওইসব ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এছাড়া ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে যারা হতদরিদ্রদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন তাদের উদ্দেশ্যে এই সাবেক কমান্ডার বলেন, কর্মহীনদের মাঝে বন্টন করা ওইসব সামগ্রীর সকল তথ্য যেন তারা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন। এর মাধ্যমে প্রশাসনের কাজে জড়িত কর্মকর্তাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।
সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের জেলা সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ফকির আখতারুজ্জামান বলেন, প্রশাসনের তরফ থেকে গ্রাম পর্যায়েও মানুষকে সচেতন করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রতিনিয়ত পাড়া মহল্লায় মাইকিং করে মানুষকে ঘরে অবস্থান করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রশাসনের লোকজন যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রামে অবস্থান করেন ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই শৃঙ্খলা মেনে চলেন। তারা চলে গেলেই এলাকা ফিরে পায় আগের রুপ। গ্রামের মানুষজন করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে উপলদ্ধি করতে পারছে না। সামাজিক দূরত্বের নূন্যতম জ্ঞানটুকু তাদের নেই। তাই তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নেয়ার জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ওয়ার্ড ও গ্রাম পর্যায়ে করোনা প্রতিরোধ কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপন জরুরী এবং এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঝুঁকি মোকাবিলায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। যে কারণে হতদরিদ্ররা তাদের কাছেও আসে। তাদের অভাব অভিযোগ জানায়। সেদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশাসনের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারলে সরকারের দেওয়া কোন সুযোগ সুবিধা থেকে হতদরিদ্ররা বাদ পড়বে না। ’৭৪ এর দুর্ভিক্ষের সময় মুক্তিযোদ্ধারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। তাই বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান তিনি।
মহামারী করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু তার একার পক্ষে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব না জানিয়ে সমাজ সেবক রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেন, করোনার করুণ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের উপলব্ধি আসতে হবে। এর সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সারাদিন আমাদের বাড়ি পাহাড়া দিতে পারবে না। এর জন্যে প্রশাসনের দিক নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রত্যেকের কর্তব্য।
তিনি বলেন, শেরপুরের বিভিন্ন নিত্য পণ্যের দোকানে প্রশাসনের তরফ থেকে মাস্ক নাই যার পণ্য নাই তার এ ধরণের পোস্টার লাগানো হয়েছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গোল চিহৃ আাঁকা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সুবিধা হচ্ছে।
তিনি এসব কাজের পাশাপাশি জনসাধারণ বাইরে বের হলে যাতে ছাতা ব্যবহার করেন এ বিষয়টিতে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি মনে করেন ছাতা মাথার উপড়ে থাকলে এক জনের সাথে অন্যজনের দূরত্ব রক্ষা করা সহজ হবে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারের একজন সদস্য যেন বাড়ির বাইরে বের হন এ বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী পদক্ষেপ চান তিনি।
গত ২০ এপ্রিল করোনাভাইরাসসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শেরপুর জেলার সাথে ভিডিও কনফারেন্স করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী করোনা রোগী যাতে আর না বাড়ে সে ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।
ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব প্রধানমন্ত্রীকে জানান, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ৩১ দফা নির্দেশনার আলোকে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবকসহ সবাই একযোগে কাজ করছে। জেলায় যথেষ্ট পিপিই মজুদ রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি উপজেলায় সরকারি ১৫০টি শয্যা আইসোলেশনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে ২১টি ক্লিনিকে আরও ১০৩টি শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলায় চার লাখ ৩৪ হাজার সুবিধাভোগী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী দিনে ও রাতের বেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সেই সাথে জেলায় উৎপাদিত শাক-সবজিও উপহারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে বেসরকারি উদ্যোগেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অনলাইন শপের মাধ্যমে জেলা শহরসহ সকল উপজেলায় মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আর জেলা প্রশাসনের হটলাইন নাম্বারে প্রতিনিয়ত সুবিধা প্রত্যাশীদের কল পাওয়া যাচ্ছে। সে অনুযায়ী খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জেলার সকল হাট-বাজার খোলা মাঠে স্থানান্তর করা হয়েছে। পৌরসভা ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় প্রতিটি হাট-বাজার ও রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটানো অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলায় সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং নির্বাহী হাকিমরা। এ পর্যন্ত আইন অমান্য করার দায়ে তিনশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া করোনা জনিত পরিস্থিতিতে দরিদ্র মা’দের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে দেশ এ স্লোগানকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের নিজস্ব অর্থায়নে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে গরীব-অসহায় প্রান্তিক কৃষকদের ধান কাটা, মাড়াই ও প্যাকেটজাত করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়তা কেন্দ্রের সহযোগিতায় খাদ্য ও আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আর এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার হতদরিদ্র ও কর্মহীন পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এর সাথে প্রায় তিন হাজার পরিবারের মাঝে শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, সরকার ১০ মে থেকে সীমিত আকারে ও শর্ত সাপেক্ষে শপিংমল এবং দোকানপাট খোলার অনুমতি দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘোষিত স্বাস্থ্য সতর্কতা অনুযায়ী ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার, ক্রয় ও বিক্রয়ের সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, প্রতিটি দোকানে প্রবেশ পথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা আর প্রতিটি দোকান ও শপিংমল খোলা এবং বন্ধের আগে জীবাণুমুক্ত করার নির্দেশনা জারি করে। যা বাস্তবায়ন করছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু এসব শর্ত মেনে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দুই দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার পর শেরপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সকল ব্যবসায়ীদের সাথে জরুরী বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকে থেকে ১২ মে থেকে আনির্দিষ্টকালের জন্য জেলার সকল শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধের ঘোষণা দেয়।
তিনি মনে করেন জেলা প্রশাসন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাই ওইসব শর্ত মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলে প্রতিনিয়ত জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। যে কারণে ব্যবসায়ী সংগঠনটি এ সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, কিছু ব্যবসায়ী এরপরও লুকোচুরির আশ্রয় নিয়ে দোকান খোলা রাখার চেষ্টা করছেন। যা মোটেও ঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। চেম্বার অব কমার্স জরিমানার ভয়েই হোক বা করোনা থেকে মানুষের জীবন বাঁচনোর তাগিদেই হোক, সকল দোকানপাট বন্ধের এই সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের করোনা রোগী সম্পর্কিত তথ্য নিশ্চিতকারি কর্মকর্তা চিকিৎসক মোবারক হোসেন ১৪ মে সকালে জানান, জেলায় এ পর্যন্ত ৪১জন করোনা শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বাকি ১৩ জনের মধ্যে ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর ১২জন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন আছেন।
শেরপুরে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুব গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, যেকোন দুর্যোগে সূর্যোদয় দেখতে চাই। আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতেই কাজ করছে জেলা প্রশাসন। তিনি জানান, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য উদ্বৃত্ত এ জেলার চাতালগুলো যেন চালু রাখা যায় সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সমাজের ধনী ব্যক্তিদের অসহায় মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহবান জানান।
বাংলার চিঠি ডেস্ক : 



















