বিদ্যালয়ের কাগজ-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নেই। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে শূন্য শিক্ষার্থী। তবুও ছয়জন শিক্ষক নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন। আর স্কুল মাঠ যেন গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এমনই চিত্র দেখা গেছে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের চরদাদনা পূর্বপাড়া মিয়া উল্লা দেওয়ানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
২৬ মে, সোমবার দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে এমনই চিত্র উঠে আসে। ভাই বোন দ্বারা গঠিত স্কুলের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় এমন চিত্র বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। এ সময় দেখা যায়, অফিস ও শ্রেণিকক্ষ আগোছালো ও অপরিষ্কার। প্রবেশ করেই দেখা গেল স্কুলে সুনসান নীরবতা। নেই শিক্ষার্থীদের কোন কোলাহল। স্কুল সংলগ্ন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক দুই ভাই-বোনের বাড়ি হওয়ায় তিনজন তিনদিক থেকে ছুটে আসেন। স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষ শূন্য। তবে আমাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে স্কুলের শিক্ষকরা তাড়াহুড়া করে শিক্ষার্থী হাজিরা খাতায় উপস্থিতি লিখে দেন।

এলাকাবাসী জানান, স্কুলে শিক্ষক ভাইবোন দের প্রকাশ্যে হাতাহাতি হওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকদের মতবিনিমিয় ও কথাবার্তা হয় না। স্কুলের প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের গাছগু নষ্ট হচ্ছে। এর কোন প্রতিকার শিক্ষকদের নেই। শিক্ষক ভাই-বোনের দ্বন্দ্বে প্রতিষ্ঠানটি মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষকদের এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে ভর্তি করানোর আগ্রহ না থাকায় শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে।
এছাড়াও প্রতি বছর স্লিপের টাকা আত্মসাত ও দ্বায়িত্বে অবহেলাসহ প্রতিষ্ঠানের নাজুক অবস্থার জন্য দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল গফুর প্রধানের অবহেলাকেও দায়ী করেন এলাকাবাসী।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়। প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত খাতা-কলমে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ জন ও শিক্ষক ছয়জন। কিন্তু বাস্তবে এই চিত্র ভিন্ন। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রাক প্রাথমিক ও দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাস এবং ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হয়। স্কুল খাতা-কলমে উপস্থিতি শতভাগ থাকলেও উপস্থিতি শূন্য।
প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এই তিন ভাই-বোন পরিচালিত বিদ্যালয়ের পাশেই তাদের বসতবাড়ি হওয়ায় শিক্ষার্থী নেই অজুহাতে প্রায় সময়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন।
প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদ এ প্রতিবেদককে বলেন, এক কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি বিদ্যালয় ও কওমি মাদরাসা হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রী কমে গেছে। এছাড়াও রাস্তাঘাট পাকা হওয়ায় অনেকেই সদরে কিন্ডারগার্টেনে লেখাপড়া করার কারণে এ বছর সমস্যাটা বেশি হয়েছে। তবে তিনি স্লিপের টাকার বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
সহকারী উপজেলা প্রথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল গফুর প্রধান এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের অফিসে লোকবল কম। দাপ্তরিক কাজসহ প্রায় ৯০ টি স্কুলে দেখভাল করতে হয়। এখনও ওই স্কুল পরিদর্শন করতে পারিনি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন এ প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। সরেজমিনে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এই স্কুলের নাজুক অবস্থা সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তৌহিদুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার বিষয়টি জানলাম। ঘটনা সঠিক হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
লিয়াকত হোসাইন লায়ন : নিজস্ব প্রতিবেদক, ইসলামপুর, বাংলারচিঠিডটকম 



















