একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির। মসজিদে আজান হচ্ছে। মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন। অন্যদিকে মন্দিরে চলছে দুর্গাপূজা। তবে আজান ও নামাজের সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে মন্দিরের মাইক, ঢাকঢোলসহ পূজার আনুষঙ্গিক কার্যক্রম। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হচ্ছে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই দৃশ্য জামালপুরের মাদারগঞ্জ পৌরসভার বালিজুড়ী বাজার এলাকার। মাত্র ৮ থেকে ১০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুরবাড়ি মন্দির। পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এমন সহাবস্থান স্থানীয়ভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
১৭ অক্টোবর, শনিবার রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমীর পূজা চলছে। আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে মন্দির প্রাঙ্গণ। বসেছে মেলাও। সারিবদ্ধভাবে মন্দিরে আসছেন হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। এরই মধ্যে পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসে এশার নামাজের আজান। আজানের পর মুসল্লিরা মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। এ সময় মন্দিরের মাইক ও ঢাকঢোল বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বালিজুড়ী বাজার এলাকায় ১৯৩৮ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুরবাড়ি মন্দির। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেখানে প্রতিবছর দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় ৮০ বছর পর ২০১৮ সালে একই আঙিনায় নির্মাণ করা হয় বায়তুল আমান জামে মসজিদের পাকা ভবন। এর আগে পাশের একটি টিনের ঘরে নামাজ আদায় করতেন মুসল্লিরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান হলেও ধর্মীয় আচার পালন নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধের কথা তাদের জানা নেই। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন তারা।
বালিজুড়ী বাজার এলাকার কণ্ঠশিল্পী শুভষ্কর দাস পলাশ বলেন, আমাদের মন্দির ও মসজিদ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য উদাহরণ। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দুই ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। এমন সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মসজিদে নামাজ পড়তে আসা আমিনুর রহমান বলেন, আমরা সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছি। মসজিদে আজান হলে এবং নামাজ চলাকালে তারা মন্দিরের মাইক ও ঢাকঢোল বন্ধ রাখেন। এভাবেই আমরা মিলেমিশে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি।
উপজেলা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের সভাপতি লিটন চন্দ্র রায় বলেন, বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও বালিজুড়ী বাজার লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুরবাড়ি মন্দির একই আঙিনায় অবস্থিত। মসজিদ থেকে মন্দিরের দূরত্ব মাত্র ৮ থেকে ১০ ফুট। কোনো বিভেদ বা ঝামেলা ছাড়াই হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, মাদারগঞ্জ উপজেলায় সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে ধর্ম পালন করে আসছেন। তাদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি রয়েছে। আশা করি, আগের বছরগুলোর মতো এবারও সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হবে। এবার উপজেলায় ২৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
খাদেমুল ইসলাম : নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 


















