দরোজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে ঘিরে শেরপুরের সংসদীয় তিনটি আসনের মধ্যে দুটি আসনের প্রার্থীরা শেষ সময়ের প্রচারনায় ব্যস্ত ও মুখর হয়ে উঠেছেন। তারা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শেষ সময়ের গণসংযোগ, নির্বাচনী সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে শেষবারের মত পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের ১১ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মু. নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
শেরপুরের দুটি আসনের নির্বাচনী এলাকার অলিগলি থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, হাট-বাজার সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আসছে ১২ ফেব্রুয়রির ভোট প্রসঙ্গ। সকাল গড়াতেই প্রার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। এলাকার উন্নয়ন ও নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তুলে ধরছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার। মাইকিং স্লোগান ও ছোট বড় পথ ও জনসভায় সরব থাকছে নির্বাচনী এলাকা।
এদিকে নিজেদের হারানো দুটি আসন পুনরুদ্ধার চেষ্টায় মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে ৫ আগস্ট পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নানা কার্যক্রম বিবেচনায় সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ভোটের পাল্লা ভারি করে চলেছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা।
শেরপুরের সংসদীয় দুটি আসনে মোট ভোটা আট লাখ ৯০ হাজার ৫২২ জন। পুরুষ ভোটার চার লাখ ৪০ হাজার ২৫৮ জন ও নারী ভোটার চার লাখ ৫০ হাজার ২৫৬ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আটজন। ভোট কেন্দ্র সংখ্যা ২৯৯টি।
ভোটাররা জানান, গণতন্ত্র বিকাশে এবং দেশের উন্নয়নে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ শান্তিপূর্ণ এক কথায় ভাল নির্বাচনের বিকল্প নেই। তারা আশাবাদী দীর্ঘদিন পর উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবার সরাসরি ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সরকারের নয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংসদে যাবেন এমনটিই মন্তব্য ভোটারদের।
শেরপুর- ১ (সদর): ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে এই আসন। মোট ভোটার চার লাখ ৫০ হাজার চারশত ৮৯ জন। পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২৪ হাজার চারশত ৭২ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ২৬ হাজার নয়জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আটজন। ভোটকেন্দ্র ১৪৫টি। নির্বাচনে এই আসনে মূলত লড়ছেন তিনজন প্রার্থী। তারা হলেন- ডাক্তার সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা (বিএনপি), হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম (জামায়াত) ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ (স্বতন্ত্র)।
তবে ভোটারেরা জানান, ভোটের মাঠে এবার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও জামায়াত প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রাশেদুল ইসলামের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ আসনে ত্রিমুখী লড়াই হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কার ভরাডুবির আশংকা করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার দলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী।
শেরপুর পৌরসভার সজবরখিলা মহল্লার ভোটার শফিকুল ইসলাম ও বাজিতখিলা ইউনিয়নের ভোটার সেলিম প্রায় অভিন্ন ভাষায় বলেন, এই আসনে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী উল্লেখযোগ্য ভোট থাকলেও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগির সুযোগে লাভবান হতে পারেন জামায়াত প্রার্থী। পৌরসভার তরুণ ভোটার ফিরোজ ওরফে রাজিব এবং নারী ভোটার নাজমুন নাহার বলেন, নারী ও তরুণ ভোটারদের ভোট যে প্রার্থী বেশি পাবেন তারই জয়ের পাল্লা ভারী হবে। তবে এবারের নির্বাচনে জামায়াতের জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তার এ জোয়ার অব্যাহত থাকলে তাদের অনুকুলেই যেতে পারে ভোটের ফলাফল।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা বলেন, দীর্ঘ সময় শেরপুর সদর আসনটি বিএনপির হাতছাড়া। এবার মানুষের মধ্যে ধানের শীষের জোয়ার তৈরি হয়েছে। যেখানে যাচ্ছি সেখানেই মানুষের মুখে ধানের শীষের কথা শুনতে পাচ্ছি। আমি শতভাগ আশাবাদী শেরপুরে ধানের শীষ প্রতীক জয়ী হবে। নির্বাচিত হলে পিছিয়ে পড়া শেরপুরকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগে উন্নত করে তুলতে চাই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর শেরপুর গড়ে তুলতে চাই।
জামায়াত তথা ১১ দলীয় জোট প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, ন্যায়-ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে বর্তমানে একটি গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। নির্বাচিত হলে উন্নত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ শেরপুর সদর গড়ার লক্ষ্যে আধুনিক ও যুগোপযোগী কৃষি বিপ্লব, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মাদকমুক্তকরণ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ সবুজ শহর গড়তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি জনগণের দাবির মুখে। বর্তমানে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। একটি গণজোয়ার আমার পক্ষে সৃষ্টি হয়েছে। আমি জনগণের প্রার্থী হিসাবে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আমরা চাই উৎসবমুখর পরিবেশে ও শান্তিপূর্ণভাবে এবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জনগণ যাকে চাইবে তাকে ভোট দিবে। যিনি নির্বাচিত হবেন আমরা তাকেই মেনে নেব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।
শেরপুর- ২ (নকলা- নালিতাবাড়ী): ২১ টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে এই আসন। মোট ভোটার চার লাখ ৪০ হাজার ৩৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ১৫ হাজার ৭৮৬ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ ২৪ হাজার ২৪৮ জন। ভোট কেন্দ্র সংখ্যা ১৫৪টি ।
নির্বাচনে এই আসনে তিনজন প্রার্থী লড়ছেন। তারা হলেন- মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী (বিএনপি), মু. গোলাম কিবরিয়া (জামায়াত), মো. আব্দুল্লাহ আল কায়েস (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)। তবে ভোটের মাঠে মূলত বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী এবং জামায়াত প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় বিতর্ক সম্পাদক মু. গোলাম কিবরিয়ার মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই হবে বলে জানান ভোটারেরা।
প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরীর বাবা মোহাম্মদ জাহেদ আলী চৌধুরী ছিলেন জোট সরকারের সময় জাতীয় সংসদের হুইপ। সর্বশেষ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনের হিসাব সম্পূর্ণই আলাদা। বিগত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র যিনিই প্রার্থী হয়েছেন তারা সবাই ছিলেন নকলা উপজেলার বাসিন্দা। এবার নালিতাবাড়ী উপজেলার সন্তান মু. গোলাম কিবরিয়া হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। নকলা উপজেলার সন্তান ফাহিম চৌধুরী হয়েছেন বিএনপি’র প্রার্থী। নালিতাবাড়ীতে ভোটের পরিমাণ নকলার চেয়ে বেশি। এছাড়াও তরুণ ভোটারেরা এবার ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করবে। অতীতের কর্মকাণ্ড বিবেচনা, তারুণ্য, প্রচারণার কৌশল আর ব্যক্তিত্বের কারণে যিনি ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন, তিনিই হবেন বিজয়ী।
বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনী এলাকার যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই বেশ সাড়া পাচ্ছি। সব জায়গায় আমার বাবা মরহুম জাহেদ আলীর চৌধুরীর উন্নয়নের ছোঁয়া রয়েছে। যেসব এলাকায় এখনও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সেসব এলাকায় কাজ করব। বিজয়ের ব্যাপারেও আমি শতভাগ আশাবাদী।
জামায়াত প্রার্থী মু. গোলাম কিবরিয়া ভিপি বলেন, বৈষম্যহীন উন্নয়নের ধারায় নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলাকে গড়তে চাই। আমি আশাবাদী এলাকার জনগণ ও তরুণ ভোটাররা পাশে থেকে আমাকে সমর্থন দিয়ে বিজয়ী করবে ইনশাল্লাহ।
মুগনিউর রহমান মনি : নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর, বাংলারচিঠিডটকম 



















