বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান বলেছেন, এ মাসের বারো তারিখ জাতির বাঁক পরিবর্তনের জন্য একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ দিন। জাতি আজ এক কঠিন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। বারো তারিখ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। আমার এবং আমাদের পরিচয় হচ্ছে আমরা গোলাম, আল্লাহর দাস, আমরা আল্লাহতায়ালার গোলাম। আল্লাহতায়ালার গোলামী যারা করে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করে না। আল্লাহতায়ালার গোলামী যারা করে তাঁরা কালো মেঘ দেখে ভয়ও পায় না। আল্লাহতায়ালার গোলামী যারা করে তারা আল্লাহর ভালোবাসা পাবার জন্য ও আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে ভালবাসে এবং মানুষকে সম্মান করে। ভালোবাসা ধমক দিয়ে আদায় করার বিষয় না। ফ্যাসিবাদি শাসন কায়েম করেও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় না।
১ ফেব্রুয়ারি, রবিবার দুপুরে শেরপুর শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্কে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী জনসভায় তিনি একথা বলেন। এ সময় তিনি শেরপুর-১ (সদর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ভিপি, শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের হাতে নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন।
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ২৪ চলছে, চলবে। ততদিন চলবে যতদিন পর্যন্ত ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি নিশ্চিত না হবে। জেগে থাকবেন, এখন থেকে পাহারা দিবেন, নির্বাচন নিয়ে কেউ যদি সন্ত্রাস চালাতে চায়, তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সমান পরিমাণ জবাব দিবেন, বেশি দিতে যাইয়েন না। তবে নিজে জবাব দেবার আগে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনকে অবহিত করবেন। যদি দেখেন প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা, এটা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে, তাহলে তখন আপনার উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে এটাকে প্রতিহত করা।
জামায়াত আমির বলেন, উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত একটি মিটিং, সেখানে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে স্পষ্ট দিবালোকে একজন আলেমে দ্বীন ও একজন বিশিষ্ট শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম, যিনি উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন, তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অবশ্য যারা হত্যা করেছেন, তাদের জন্য এটা নতুন না। তারা তো তাদের নিজের দলেরই দুই শতাধিক মানুষকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে। যে রাজনীতি মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে মানুষকে খুন করে ফেলে। এ কোন রাজনীতি? তিনি জনগনকে প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা কি এই রাজনীতি চান? অথচ এই রাজনীতিই ৫৪ বছর ধরে চলেছে।
তিনি বলেন, মাওলানা রেজাউল করিমের হত্যাকান্ডের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একজনকেও গ্রেপ্তার করা হল না। এই খুনের সাথে যারা জড়িত আমরা তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার দেখতে চাই। আমরা সভ্য এবং ভদ্র। তাই বলে আমাদের দুর্বল ও কাপুরুষ ভাববেন না। আমরা নিজেরা কখনো আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাই না।
জামায়াত আমির বলেন, এই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মজলুম সংগঠনের নাম হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এক এক করে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় জামায়াতের ১১ জন শীর্ষ নেতাদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। হাজারেরও বেশি নেতাকে দুনিয়া থেকে বিনা বিচারে বিদায় করা হয়েছে। সাতশোর মত সহকর্মীকে আয়না ঘরে বন্দি রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটজনের হদিস আমরা এখনও জানি না। তাঁদের মায়েরা জীবন্ত সন্তান অথবা একটা কবরের অপেক্ষায় আছেন। সন্তান যদি বেঁচে না থাকে তাহলে কবরটি কোথায়? সন্তানের কবর থেকে একটু মাটি বুকে লাগাতে চান, কপালে লাগাতে চান, একটু প্রশান্তি পেতে চান। এই মায়েদের কাছে আমাদের কোন জবাব নাই। বিশেষ করে ২৪ এ যাদেরকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে, তাঁদের পরিবারের কাছে আমাদের কোন জবাব নাই। আমরা ঘুরে ঘুরে তাঁদের কাছে গিয়েছি। আমি তাদের চোখে পানি দেখি নাই, তাদের চোখে টকটকে রক্তের ফোটা দেখেছি।
তিনি বলেন, আমরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলা বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকবো না বলে ঘোষণা দিয়েছিলাম। আমাদের কর্মীরা এসব কাজ করে নাই। বিভিন্ন যায়গায় মা-বোনদের অসম্মানিত করা হচ্ছে। গায়ে পর্যন্ত হাত দেওয়া হচ্ছে। কোন কোন উন্মাদ তো গায়ে থেকে কাপড় খুলে ফেলতে বলেছেন। যারা এ কাজটি করছেন তারাও মায়ের সন্তান। তাদের কাছে অনুরোধ প্লিজ আপনাদের মা, স্ত্রী, বোন, মেয়েকে সম্মান করতে শিখুন। আর তা না করতে পারলে আপনি মানুষ নামের কলঙ্ক। ওইসব মানুষদের সাবধান করে দিচ্ছি, মায়ের গায়ে হাত দিলে বাংলাদেশ বিস্ফোরিত হবে।
শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সামিউল হক ফারুকী, জামায়াতের সাবেক জেলা আমির ডাক্তার মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন, সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল বাতেন, জেলা জামায়াতের মজলিশে শুরার সদস্য ডাক্তার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন, অধ্যাপক আবুবকর সিদ্দিক, ডাকসুর জিএস এস. এম ফরহাদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক ইউসুফ ইসলাহী, এবি পার্টির আহবায়ক শাহজাহান মল্লিক, সাধারণ সম্পাদক মো. মুকসিতুর রহমান হীরা, এনসিপির জেলা সমন্বয়কারী প্রকৌশলী মো. লিখন মিয়া, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের শেরপুর জেলা সভাপতি মাওলানা শফিকুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল হালিম, ইসলামী ছাত্রশিবির শেরপুর জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুজ্জামান মাসুম, জুলাই যোদ্ধা খোকন চন্দ্র বর্মন প্রমুখ। এছাড়াও এগারো দলীয় ঐক্যজোটের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আমিরে জামায়াত জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলায় শায়িত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সদ্য শহীদ মাওলানা রেজাউল করিমের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে কথা বলেন।
মুগনিউর রহমান মনি : নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর, বাংলারচিঠিডটকম 



















