শেরপুরের নকলা উপজেলার নদ-নদীর চরাঞ্চলনে ও ছোট-বড় বিলপাড়ের যেদিকে দৃষ্টি যায় দিগন্তজুড়ে শুধু সরিষার মাঠ নজরে পড়ে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছ। গত বছরের চেয়ে ২৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ বেড়েছে। এবার সরিষার আশাতীত ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভাল ফলনের আশায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নকলা উপজেলায় সরিষা চাষ হয়েছে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে। আর গত বছর এর চাষ হয়েছিল পাঁচ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে। সরিষা চাষ বৃদ্ধির কারণ হিসাবে জানা গেছে, কৃষকদের মাঝে সরকারি প্রণোদনা প্রদান, পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বীজ-সার বিতরণ ও অধিক লাভের আশায় কৃষকদের দিন দিন আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে বলেন, উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়ন, চরঅষ্টধর, টালকী, পাঠাকাটা, বানেশ্বরদী, গৌড়দ্বার, নকলা ও উরফা ইউনিয়নসহ পৌরসভায় সরিষা চাষ করা হয়েছে। তবে চন্দ্রকোনা, চরঅষ্টধর, পাঠাকাটা, বানেশ্বরদী ও উরফা ইউনিয়নে চাষ বেশি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সরিষা চাষের উপযোগী সব জমিকে আবাদের আওতায় এনে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা ও কৃষিপণ্য উৎপাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের পরামর্শ সেবা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিন হাজার কৃষককে দেওয়া হয়েছে প্রণোদনা। উপজেলার প্রায় সব এলাকার কৃষকেরা গত কয়েক বছর ধরে সরিষা চাষ করে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন। তাই দিন দিন উপজেলায় সরিষা চাষ বাড়ছে।

বানেশ্বরদী ইউনিয়নের কায়দা গ্রামের বিধবা কৃষাণী মোছা. রাশিদা বেগম শান্তি বলেন, আমি ২০ শতাংশ জমিতে মধ্যবর্তী ফসল হিসেবে সরিষা আবাদ করি। সরিষা উঠানোর পরে ওই জমিতে বোরো ধান রোপণ করব। সরিষা চাষে যা খরচ হয়েছে এবং যা খরচ হবে। তার দ্বিগুণ লাভ হতে পারে।
ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. ছাইদুল হক বলেন, সরিষা একটি মধ্যবর্তী ফসল। তাছাড়া সরিষায় উৎপাদন খরচ কম। কিন্তু লাভ বেশি পাওয়া যায়। তাই আগাম আমন ধান কাটার পরে তাদের সব জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। অন্যান্য কৃষকেরা জানান, সরিষা উঠিয়ে ওই ক্ষেতে বোরো আবাদ করা হবে। এই বোরো আবাদে বাড়তি চাষ, সার লাগেনা ও পরিশ্রম কম লাগে। কিন্তু ফলন ভাল হয়।
নবাগত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল ওয়াহেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, এ বছর নকলা উপজেলায় স্থানীয় জাতের পাশাপাশি বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১১ ও স্থানীয় টরী-৭ জাতের সরিষা আবাদ করা হলেও সবচেয়ে বেশি আবাদ করা হয়েছে যথাক্রমে বারি সরিষা-১৪, টরী-৭ ও বিনা-৯ জাতের সরিষা।
তিনি বলেন, এ বছর নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে ধান খেতে বিনাচাষে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এ আবাদ চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরবাছুরআলগী এলাকায় বেশি হয়েছে। নতুন এই প্রযুক্তিতে আমন ধান কাটার সাত থেকে ১০ দিন আগে ধান ক্ষেতে প্রতি বিঘাতে এক কেজি করে সরিষা বীজ বপণ করা হয়। ধান কাটার পরে সরিষাতে সামান্য সার ও প্রয়োজনে হালকা সেচ দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। এতে একদিকে জমি চাষ ও বীজ বপণের আগে জমিতে সার বাবদ খরচ লাগে না। অন্যদিকে জমিতে সঠিক সময়েই বোরো ধান রোপণ করা যায়। আগামী বছর থেকে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সরিষা চাষ বাড়বে বলে আশা করছি।
কৃষিবিদ মো. আব্দুল ওয়াহেদ আরও বলেন, সরিষা চাষের উপযোগী সব জমিকে সরিষা চাষের আওতায় এনে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে ও সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগের সম্মুখীন না হলে এ বছর উপজেলায় সরিষার বাম্পার ফলন হবে। উৎপাদনও বাড়বে বলে আশা করছি।
শফিউল আলম লাভলু : নিজস্ব প্রতিবেদক, নকলা (শেরপুর), বাংলারচিঠিডটকম 



















