নবাগত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী জেলায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সামর্থ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে তা সমাধানের উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেড় শতাধিক বছরের প্রাচীন জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরিটি গত ১৫ বছর ধরে অনাদর, অবহেলা আর ব্যাপক অযত্নের ফলে ভৌতিক গৃহে পরিণত হয়েছিল। পোকা-মাকড়ের কবলে পড়ে বইগুলো ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাঠের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় বইপ্রেমী পাঠকদের। বছরের পর বছর দু’জন লাইব্রেরিকর্মী বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত থাকেন। মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয় এই সৃজনশীল জায়গাটি।
সুদীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে জেলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ পাঠকসমাজ। অবশেষে জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরি প্রাণ ফিরে পেয়েছে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলীর স্পর্শে।
তিনি পাবলিক লাইব্রেরি দুরাবস্থার কথা জানার পরেই সরেজমিনে দেখতে যান। তার দিকনির্শেনা ও পরিকল্পনায় লাইব্রেরির সংস্কার কাজ শুরু হয়। এগিয়ে আসে জেলা পরিষদ ও জামালপুর পৌরসভা। ১২ দিনের মাথায় পাঠোপযোগী পরিবেশ হয়ে উঠে লাইব্রেরিটি।
আধুনিকমানের আসবাবপত্রে সাজানো হয় পড়ার টেবিল ও বসার চেয়ার। লাইব্রেরিয়ানের টেবিল, চেয়ারও মানসম্মত হয়েছে।
নিকষ অন্ধকার দূর হয়ে আলোকিত হয়ে উঠেছে থরেথরে সাজানো বইঘরটি। লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে কৃত্রিম গাছে বাবুই পাখির বাসা এবং বই, কলমের দৃষ্টিনন্দন আল্পনা অন্যরকম আবহ তৈরি করেছে। সত্যিকারের শৈল্পিক অঙ্গন হয়ে উঠার পথে প্রাণের লাইব্রেরি।
আমাদের শৈশব, কৈশোর তথা ছাত্রজীবনে লাইব্রেরিটি ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার বাতিঘর। বই পড়ার নেশায় প্রতিদিন এখানে আসা যাওয়া ছিল আমাদের রুটিন কাজ। আমি নিবন্ধিত সদস্য থেকে পরবর্তীতে আজীবন সদস্য পদ লাভ করি।
এই লাইব্রেরি মিলনায়তনে বিভিন্ন সংগঠন নানা ধরনের সৃজনশীল অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। সাহিত্যের আসর বসতে প্রতিনিয়ত। বইমেলা, নকশিকাঁথার মেলাসহ গান আর নাটকের। কবিতীর্থ ও আবৃতি সংগঠন ষড়ঙ্গের জন্ম হয় এই লাইব্রেরি থেকে।
কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ সামছুল হক, বরেণ্য কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন, বিখ্যাত নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুন, জার্মান প্রবাসী লেখক আব্দুল্লাহ আল হারুন, দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনসহ সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের পদস্পর্শে ধন্য হয়েছে জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরি।

গত ১৫ বছরে এই লাইব্রেরিতে সরকারিভাবে কোন বই বরাদ্দ আসে নাই। ব্যাপক আর্থিক সঙ্কটের কারণে পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে এই লাইব্রেরির ইতিহাস ঐতিহ্যের গল্পগাঁথা চেপে রাখা হয়।
১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বিকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলীর নেতৃত্ব জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, ডিডিএলজি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ, কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ।স্থানীয়দের মুখে স্মৃতিগাঁথা গল্প শোনে লাইব্রেরিটিকে সমৃদ্ধ করতে জেলা প্রশাসক কমিউনিটির লোকজনের সহায়তা কামনা করেন।
প্রস্তাবনা আসে পুনরায় বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠান আয়োজন করার। নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে নানা আয়োজনের আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
এ ব্যাপারে প্রচারণার জন্য তথ্য অফিস ও উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বাবু। জামালপুর পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মৌসুমী খানম বলেন, লাইব্রেরিটিকে আধুনিকমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সহায়তা করা হবে।
জাহাঙ্গীর সেলিম : সম্পাদক, বাংলারচিঠিডটকম 



















