জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া এলাকার মো. মানিক। বয়স ১৯ বছর হলেও তার শরীর ও কণ্ঠশব্দ শিশুদের মত। অনেকে প্রথমে তাকে ছোট শিক্ষার্থী ভেবেই ভুল করেন।
কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্রতা ও সামাজিক বিদ্রুপকে জয় করে মানিক এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মানিক উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া এলাকার দিনমজুর রবিউল ইসলামের ছেলে।
জানা গেছে, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ মানিকের শারীরিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। দরিদ্র বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী সুচিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। সমবয়সীরা বড় হলেও মানিকের শরীর শিশুর মতই রয়ে যায়। কণ্ঠেও কোন পরিবর্তন আসেনি। এই ভিন্ন গঠন ও কণ্ঠের কারণে বন্ধু, শিক্ষক, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছে নানা বিদ্রুপ ও অবহেলার মুখোমুখি হতে হয় তাকে।
তবুও মানিক থেমে যাননি। পশ্চিম পলিশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী পরীক্ষা শেষে ভর্তি হন পলিশা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৩.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। পরবর্তীতে মির্জা আজম কলেজে ভর্তি হয়ে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেন।
মানিক এ প্রতিবেদককে বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ভেঙে পড়িনি। লেখাপড়া চালিয়ে গেছি। পরিবারের অবলম্বন হতে চাই। নিজের স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা কামনা করি। লেখাপড়ার পাশাপাশি যদি একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতাম, তাহলে আরও ভাল হত।
মানিকের বাবা রবিউল ইসলাম জানান, ছোট থেকে ঠিকঠাকই বড় হচ্ছিল মানিক। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে হঠাৎ বৃদ্ধি বন্ধ হয়। আর্থিক সমস্যায় উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। তবু আমরা হতাশ হইনি। লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা দিয়েছি। আশা করি কেউ উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে মানিক আরও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পানা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন এ প্রতিবেদককে বলেন, মূলত মানিকের শারীরিক বৃদ্ধি হরমোনজনিত জটিলতায় আটকে গেছে। বয়ঃসন্ধিকালে তার সঠিক চিকিৎসা হলে তাকে অনেকটাই স্বাভাবিক করা সম্ভব ছিল। তার হাড়ের গঠন, হরমোনসহ শারীরিক পরীক্ষার পর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত বলা যাবে। তবে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হলে পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম খালেক এ প্রতিবেদককে বলেন, মানিকের গল্প সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে¡ও সে যে নিজের প্রচেষ্টায় এতদূর এসেছে। তা প্রশংসার দাবিদার। নিয়মিত তার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। সমাজসেবা অফিসের পক্ষ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যদি কোন দাতা সংস্থা বা ব্যক্তি তার উন্নত চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে চান, তবে সব ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি। মানিকের মত তরুণেরা সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়ায়। যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও মনোবল, অধ্যবসায় ও সাহস থাকলে সফলতা অর্জন সম্ভব।
খাদেমুল ইসলাম : নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারগঞ্জ, বাংলারচিঠিডটকম 


















