টিভি’র খবর পাল্টে দিল তরমুজ নিয়ে বাতেনের সিদ্ধান্ত

নিজের তরমুজ ক্ষেতে আব্দুল বাতেন। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম

সুজন সেন, নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর
বাংলারচিঠিডটকম

২০১৯ সালে ঘরে বসে টেলিভিশন (টিভি) দেখছিলাম, হঠাৎ একটি খবর দেখতে পাই বাজার থেকে কেনা তরমুজ খেয়ে এক বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ সময় আমি সিদ্ধান্ত নেই আমার বাচ্চাকে বাজার থেকে কেনা তরমুজ খাওয়াবো না। এর কিছু দিন পরই আমার বাচ্চা তরমুজ খাওয়ার জন্য বায়না ধরে। চিন্তা করলাম আমিতো তরমুজ চাষ করিনা, স্বভাবত বাজার থেকেই তা কিনতে হবে। কিন্তু আমিতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাজারের তরমুজ বাড়িতে আনবো না। এ কারণে বাচ্চাকে সান্ত্বনা দিলাম, বাবা বাজারের তরমুজ ভালো হবে না। পরের বছর আমি তরমুজ চাষ করে পরে খাওয়াবো। এ সময় বাচ্চার কান্না আর সহ্য হলো না, আর সে সময় তরমুজের চারা লাগানোর সময়ও শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমারও করার কিছু ছিল না। যাই হোক পরের বছর ২০২০ সালে নিজের পাহাড়ি জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০-২৫টি তরমুজের চারা রোপণ করি। এর কিছুদিন পর লক্ষ্য করি পাহাড়ি মাটিতে তরমুজের ফলন খুব ভালো হয়েছে। ওই সময়ে প্রায় ৭০-৮০টি তরমুজ পাই যার প্রতিটির ওজন ছিল ১২-১৮ কেজি। পরে আমার বাচ্চাকে বাগানে উৎপাদিত তরমুজ খাওয়াই এবং আমি নিজেও খাই। ওই তরমুজগুলো খুবই সুস্বাদু ও মিস্টি এবং কালারও (রং) খুব সুন্দর ছিলো। তরমুজগুলো ছিলো ট্রপিকেল ড্রাগন জাতের। পরে চিন্তা করলাম ফলন যেহেতু ভালো হয়েছে তাহলে বাণিজ্যিকভাবে তা চাষ করা সম্ভব। তাই এ বছর বাণিজ্যিক আকারেই তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। প্রশ্নের জবাবে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেন, শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতীর আব্দুল বাতেন। তিনি উপজেলার ৩ নম্বর নলকুড়া ইউনিয়নের হলদি গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দীনের ছেলে তিনি। বাতেন পেশায় চীফ জুডিসিয়াল ম্যজিস্ট্রেট আদালতের একজন গাড়ি চালক।

তরমুজ মূলত বেলে দোঁআশ মাটির ফসল। কিন্তু পাহাড়ি এলাকার এটেল বা এসিডিক মাটিতে এ ফসল উৎপন্ন হওয়ায় এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই পাশের শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষকরা তরমুজের ফলন দেখতে বাতেনের বাগানে ভীড় করছেন। কেউ কেউ পরের বছর তাদের পাহাড়ি জমিতে তরমুজের আবাদ করবেন বলে ইচ্ছা পোষণ করেছেন। আবার কেউ পাহাড়ে তরমুজ ফলানোর বিষয়টিকে সন্তানের জন্য বাবা’র ব্যতিক্রমী উপহার হিসাবে দেখছেন।

বাতেন জানান, বাড়তি আয়ের আশায় ২০১৩ সালে হলদি গ্রামের পাহাড়ি টিলার নিজস্ব ৭৫০ শতাংশ জমিতে নানা জাতের ফলের মিশ্র বাগান গড়ে তোলেন। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেন আম, কাগজি ক্রস লেবু, সিডলেস এলাচি লেবু, মাল্টা, পেঁপে, জাম্বুরা ও কমলা। আর এ বাগান থেকে আশানুরুপ লাভও পান। সন্তানকে বিষমুক্ত ফল খাওয়ানোর ইচ্ছা থেকে তরমুজ চাষ করা হয়। সেখানেও সফলতা আসে। তাই চলতি বছর ১০০ শতাংশ জমিতে মাল্টা বাগানের ফাঁকে ফাঁকে বাণিজ্যিকভাবে আবাদ করেন তরমুজ। এ জন্য তার এক লাখ টাকা খরচ হয়। তিনি বলেন, স্থানীয় কৃষি অফিসের বীজের ডিলারের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের ট্রপিকেল ড্রাগন জাতের একশ গ্রাম তরমুজ বীজ সংগ্রহ করেন। এর দাম পড়ে আড়াই হাজার টাকা। আর এ থেকে প্রায় আড়াই হাজার চারা পাওয়া যায়। এরমধ্যে অসাবধানতায় একশ চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর তিনি দুই হাজার চারশ চারা মাল্টা বাগানের ফাঁকে ফাঁকে ৭-৮ ফুট দূরত্ব রেখে বপন করেন। প্রতিটি গাছে ৭-৮টি করে তরমুজ এসেছে। বর্তমানে বয়স ভেদে এক একটি তরমুজের ওজন হয়েছে ৩-৫ কেজি। গেল অগ্রহায়ণ মাসে ওইসব চারা রোপণ করা হয়েছিল। আর চৈত্র মাসের শেষে ফল পরিপক্ক হলে প্রতিটি তরমুজের ওজন হবে প্রায় ১২-১৮ কেজি। পোঁকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত স্প্রে ব্যবহার না করে পুরো তরমুজ বাগান জুড়ে বসিয়েছেন সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ। ওই বাগান থেকে ১২ হাজার ৫০০টি তরমুজ পাওয়া যাবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা।

আবাদ কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তরমুজ বীজ বপন করার আগে তা ১৮ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর পানি থেকে বীজ আলাদা করে ৬ ঘন্টা রোদে শুকাতে হয়। পরে এক ঘন্টা ঠান্ডা স্থানে রাখার পর তা রোপণ করার জন্য উপযুক্ত হয়। বপনের এক সপ্তাহের মধ্যে বীজ থেকে চারা অঙ্কুরোদগম হয়। আর আশানুরুপ ফলন পেতে আগে থেকে ক্ষেতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। ওই জমিতে চারা রোপনের পর টিএসপি, পটাস ও বরুণ সার দিতে হয়। তবে তিনি তরমুজ দ্রুত বৃদ্ধি করতে ক্ষতিকর হরমোন ব্যবহার করেন না বলে জানান।

সরেজমিনে ওই তরমুজ চাষির ক্ষেতে গেলে কথা হয় বাগান পরিচর্যাকারী কোপেন কোচ, রেহানতি কোচ, ময়না কোচ ও সুমি কোচের সাথে। তারা বলেন, জেলার পাহাড়ি এলাকায় এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ হচ্ছে। তাই এর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে বাগানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তারা। প্রতিটি গাছের গোড়া আগাছা মুক্ত রাখা। সময় মতো পানি দেওয়া। কোন তরমুজ রোগাক্রান্ত হলে তা বাগান থেকে আলাদা করে ফেলা এবং সারা বাগান জুড়ে বসানো শতাধিক সেক্স ফেরোমেন ফাঁদের কার্যকারিতা ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিটি দিন পার হয়। প্রত্যেকে এর পারিশ্রমিক হিসাবে দিনে ৩০০ টাকা করে পেয়ে থাকেন। তরমুজ বাগানের মাটি তৈরির সময় থেকে তারা প্রায় ৬ মাস যাবত এ বাগানে কর্মরত আছেন।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জীবনে প্রথম শোনলাম পাহাড়েও তরমুজের ফলন হয়। তিনি বিষয়টিকে সন্তানের জন্য বাবা’র ব্যতিক্রমী উপহার বলে উল্লেখ করেন।

পাহাড়ে তরমুজ চাষের সফলতা দেখতে আসা পার্শ্ববর্তী উপজেলার কৃষক শ্রীবরদীর আলমগীর ও ঝিনাইগাতীর আলামিন বলেন, প্রতিটি গাছে আসা ফল পরিপুষ্ট। আর গাছের বৃদ্ধির হারও সন্তোষজনক। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, পাহাড়ে তরমুজ চাষের বিষয়টি তাদের কৃষি জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। এ সময় আলমগীর আগামী বছর তার পাহাড়ি এলাকার ২০০ শতাংশ ও আলামিন ৮০ শতাংশ জমি তরমুজ চাষের আওতায় আনবেন বলে জানান।

কৃষি বিভাগে চাকরি জীবনে পাহাড়ে তরমুজ ফলনের ঘটনা এবারই প্রথম দেখলেন জানিয়ে ঝিনাইগাতীর কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, এর শুরু থেকেই বাতেন তরমুজ বাগান পরিচর্যার বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা চায়। সে অনুযায়ী তাকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সকল প্রকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই বাগান বেশ কয়েকবার পরিদর্শন করেছেন বলে জানান তিনি।

Views 118   ফেসবুকে শেয়ার করুন!
সর্বশেষ
sarkar furniture Ad
Green House Ad