মৎস্য খাতে বাংলাদেশের সাফল্য এবং সম্ভাবনা

Fish_BDবাংলারচিঠি অনলাইন ডেস্ক॥
নদী মাতৃক বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান দিন দিন বেড়েই চলেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবদেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাছে ভাতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে খাদ্য তালিকায় আমিষের ৬০ ভাগ যোগান দিচ্ছে মাছ। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত দেশীয় এ মাছ খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিগুণে ভরপুর।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বের পর মৎস্য খাতকেও অতি গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সরকার নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এটি সঠিকভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদ উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করবে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত পাঁচ বছরে জাতীয় মাছ ইলিশসহ অন্যান্য প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

গত পাঁচ বছরের মৎস্য উৎপাদনের সরকারের সাফল্যকে অর্থনীতিবিদরা প্রশংসা করছেন। বর্তমানে বিশ্বে মৎস্য সম্পদ উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবি থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৭.০১ লাখ টন, সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ তথা মৎস্যবান্ধব কার্যক্রম এবং চাষী-উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাহিদামাফিক কারিগরি পরিসেবা প্রদানের ফলে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৪.১০ লাখ টন। সর্বশেষ ২০১৬- ১৭ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৪১ লাখ টন ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এই খাত থেকে উৎপাদিত হয়েছে ৪২ লাখ টন।

মৎস্য খাতে প্রবৃদ্ধির এ ক্রমধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২০-২১ সনের মধ্যে দেশে মৎস্য উৎপাদন ৪৫.৫২ লাখ টন অর্জিত হবে বলে আশা করা যায়। ফলে ২০২০-২১ সনে দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রক্ষেপিত মৎস্য চাহিদা (৪৫.২৮ লাখ টন) পূরণ করা সম্ভব হবে। গত ১০ বছরের মৎস্য উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক (গড় প্রবৃদ্ধি ৫.৪৯ শতাংশ) এবং এক্ষেত্রে প্রায় স্থিতিশীলতা বিরাজমান।

উন্নয়নশীল দেশ হবার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে দারিদ্রতা নিরসন করা। আর এই দারিদ্রতা হ্রাসের অন্যতম উপায় হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। মৎস্য খাত এ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর এ খাতে প্রায় ছয় লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। গত ১০ বছরে প্রায় ৬০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ কোন না কোনভাবে মৎস্য চাষ ও মৎস্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর। উন্মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬ হাজার ৪৩৪ হেক্টর। জানা গেছে, দেশে মোট হ্যাচারির সংখ্যা ৯৪৬। এর মধ্যে সরকারী মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারের সংখ্যা ১৩৬। আর বেসরকারী মৎস্য হ্যাচারির সংখ্যা ৮৬৮। মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের দাবি দেশে দিনদিন বাড়ছে হ্যাচারি এবং ফিশারির সংখ্যা।

মৎস্য খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের মাঠ পর্যায়ে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল,

১) মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান

২) পোনা অবমুক্তি কার্যক্রম ও বিল নার্সারি স্থাপন

৩) সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন

৪) পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ

৫) মৎস্য খাতে বিভিন্ন ধরনের অধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই রুইজাতীয় মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পাঙ্গাস, কৈ, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া মাছের উৎপাদনের ক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় অপ্রচলিত মৎস্যপণ্য যেমন- কাঁকড়া ও কুঁচিয়ার চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে।

বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকারের হাত ধরে মৎস্য খাতে উন্নয়নের যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তা আগামী পাঁচ বছর বজায় থাকলে এই খাত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সূত্র : বাংলার আমরা।