একটি অভিযোগ : শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ

একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে জামালপুর জিলা স্কুলে গিয়েছিলাম। সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকগণ ‘গণ প্রহারের কথা অস্বীকার করেছেন” আমি চতুর্থ শ্রেণির কক্ষে গিয়ে শিশুবান্ধব আলোচনা করেছি। শিশুরা যাতে ক্লাশে কোলাহল না করে, শিক্ষক পাঠদান করার সময় তারা যেনো মনোযোগী থাকে, বড়দের সম্মান করতে শিখে, স্ব স্ব ধর্ম পালন করে ইত্যাদি বিষয়ে তারা যাতে নিয়মিত চর্চা করে সে উদ্দেশে সবাইকে হাত তুলে শপথ করিয়েছি।যে সকল শিশুদের রোল নম্বর দিয়ে বলা হয়েছিলো বেদম প্রহারের কথা তাদের দুই একজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলে তারা বেদম প্রহারের কথা অস্বীকার করেছে। তবে মাঝেমধ্যে একটু শাসন করা হয় বলে তারা আমাকে জানায়। কোনেআ শিক্ষক বেত নিয়ে ক্লাশে ঢুকে না বলে ছাত্ররা অবলিলায় স্বীকার করেছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক, অভিভাবকদের সাথে কথা বলেছি। সবাই বলেছে বেত্রাঘাত নয় আমরা আদরমাখা শাসন চাই।

আামার এই লেখার পিছনে শিক্ষক মারলো কি মারলো না এটা বড় করে দেখছি না।

উন্নয়নশীল দেশে বাস করে একটি শ্রেণি কক্ষে ৭৭ জন ছাত্র গাদাগাদি করে বসে একজন শিক্ষকের পাঠ পরিচালনায় মনোযোগী হবে এটা কল্পনা করাটাও অসম্ভব। আমি নিজে কালকে ওই ক্লাশে প্রবেশের আগে দেখেছি শিক্ষক পিছনে ফিরে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখছে পিছনের সারিতে বসা ছাত্ররা হৈ হুল্লোর করছে। শিক্ষক বলার পর ওরা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে সম্মান জানান। এটা বড় বিষয় নয়। শিশুরা ভুল করবে এটাই তাদের ধর্ম। আর এই ভুল শুধরে দেয়ার দায়িত্ব যেমন শিক্ষকদের তেমন অভিভাবকদেরও রয়েছে।

প্রত্যেক শিশু পাবিবারিক শিক্ষা থেকে জীবন দক্ষতার দিকে এগুতে থাকে। তার সুস্থ বিকাশ তরান্বিত হয় পরিবারের সদস্যদের আচরণ, খাদ্য সরবরাহ, সংষ্কৃতি চর্চা, ধর্মীয় শিক্ষাসহ সুস্থধারার জীবন প্রবাহ থেকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন আধুনিক পাঠদান ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ করে ক্লাশে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত (১:৩০) এর কোনো ব্যবস্থা নেই। শুন্যপদ পূরণের আগ্রহ নেই। একটি জেলা শহরে একাধিক সরকারি নিয়ন্ত্রনাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগ্রহ নেই। বা সামর্থ্য সৃষ্টি করা উদ্যোগ নেই। তেমনি প্রাইভেট সেক্টরগুলো শুধুমাত্র বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যঙের ছাতার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা এখানে গৌন। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেন না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহশিক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সাহিত্য-সংষ্কৃতি চর্চা নেই বললেই চলে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কৃত্তিমতাপূর্ণ। শুধু আড়ম্বতা। আমাদের সময় দেয়া পত্রিকা বের করতাম। শরীর চর্চা করতাম। টিফিন পিরিয়ডে নানা খেলা খেলতাম। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। চিত্রাঙ্কন করতাম। এসব এখন আর হয়না। অনেক স্কুলেতো অ্যাসেমব্লিই হয় না। স্থানীয় শিক্ষা বিভাগ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিন।

স্কুলে শারীরিক মানুসিক আঘাত করা হাইকোর্ট থেকে বন্ধের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বিদ্যালয়ে মানসিক যে বৈকল্য শুরু হয়েছে তা রোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে মেধাহীন প্রজন্ম বেরিয়ে আসবে। যারা ফার্মের মুরগির মতো অবিকল হবে। জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এ লেখা হয়তো আপনাদের নজরে আসবে না। স্থানীয় প্রশাসনের যদি কেউ পাঠ করেন দয়া করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনলে খুশি হবো।

অপরদিকে অভিভাবকেরা এখন বুদ হয়ে থাকে স্টার জলসা আর ফেসবুকের গভীরে। সন্তান কি করছে না করছে এদিকে তাদের নজর দেওয়ার সময় নেই। আবার অবুঝ শিশুর হাতে তারা ঠিকই স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছে। যেখানে ন্যুড ছবি থেকে শিশু ও তরুণরা অপসংস্কৃতিতে মত্ত হয়ে পড়ছে। কোচিং সেন্টারে সন্তানদের নিয়ে গিয়ে অভিভাবকগণ আজাইরা গল্পগুজবে মেতে থাকে। আমার দেখা জামালপুরে একাধিক সংসার ভাঙ্গার পিছনে রয়েছে কোচিং আড্ডা। কথাগুলো শুনতে অশ্লিল মনে হলেও এটাই খাঁটি বাস্তবতা।

তাই এই গ্রহণের কাল থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থা। পরিবারভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে। শিশু আইন, শিশু অধিকার সনদ, শিশু সুররক্ষা নীতিমালা, শিক্ষা নীতিমালাসহ সকলের মধ্যে শালীনতাবোধ, সাংস্কৃতিক মূলবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতিনীতি অনুস্বরণ করতে হবে। সবাই সুস্থ থাকুন।

জাহাঙ্গীর সেলিম
সম্পাদক
বাংলারচিঠি ডটকম